সংক্ষেপে
জমি বা ফ্ল্যাটের মালিককে প্রতি অর্থবছরে (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয়, লোকমুখে যার নাম খাজনা। অনলাইনে দিতে ldtax.gov.bd -তে 'নিবন্ধন করুন' থেকে NID নম্বর, NID-তে লেখা জন্মতারিখ আর সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন। এরপর দাখিলা বা নামজারি খতিয়ানের তথ্য দিয়ে নিজের হোল্ডিং যুক্ত করুন। ইউনিয়ন ভূমি অফিস যাচাই করলে বকেয়াসহ করের অঙ্ক দেখাবে।
মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ে টাকা দিলে কিউআর কোডযুক্ত দাখিলা নিজে থেকে তৈরি হয়। বছরের কর ৩০ জুনের মধ্যে দিলে জরিমানা নেই। দাখিলা আসল কি না দেখতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের 'ভূমি' অ্যাপের কিউআর যাচাই ব্যবহার করুন।
নিবন্ধন, হোল্ডিং যুক্ত করা, কর পরিশোধ আর দাখিলা নামানো এখান থেকেই।
এই লেখায়
১. কে দেবেন, কবে পর্যন্ত
ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী করের বছর এখন অর্থবছর, মানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। কোনো বছরের কর সেই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে দিলে জরিমানা লাগে না। যেমন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া দেওয়া যাবে। এর পরে তা বকেয়া হিসেবে ধরা হয়।
- টানা ৩ বছর বকেয়া রাখলে প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত বছরে ৬.২৫ শতাংশ হারে জরিমানাসহ টাকা আদায় হয়, আর তৃতীয় বছর শেষে সার্টিফিকেট মামলা হতে পারে।
- এই করের দাবি কখনো তামাদি হয় না, তাই পুরোনো বকেয়াও শেষ পর্যন্ত দিতে হয়।
- চাইলে বকেয়া ও হালের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কর অগ্রিম দেওয়া যায়।
- শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি বা পরিবারের মোট কৃষিজমি ৮.২৫ একর (২৫ বিঘা) পর্যন্ত হলে কর মওকুফ। এর বেশি হলে পুরো কৃষিজমির কর দিতে হয়।
- জমির পরিমাণে শতাংশের ভগ্নাংশ থাকলে পরের পূর্ণ শতাংশ ধরে হিসাব হয়, তাই অন্তত এক শতাংশের কর দিতে হয়।
মওকুফের আওতার কৃষিজমির জন্যও সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে মওকুফ দাখিলা নেওয়া যায়, অনলাইনেও। জমি যে আপনার ভোগদখলে আছে, তার প্রমাণ হিসেবে এটা কাজে লাগে।
২. নিবন্ধন আর হোল্ডিং যুক্ত করার ধাপ
- ১অ্যাকাউন্ট খুলুনldtax.gov.bd খুলে 'নিবন্ধন করুন' চাপুন। এটি ভূমি সেবার এলএসজি অ্যাকাউন্ট খোলার পাতায় নিয়ে যায়, একই অ্যাকাউন্টে নামজারিসহ অন্য ভূমি সেবাও নেওয়া যায়। সচল মোবাইল নম্বর, NID নম্বর আর NID-র জন্মতারিখ দিন, মোবাইলে আসা ওটিপি বসিয়ে পাসওয়ার্ড ঠিক করুন। NID যাচাই বাধ্যতামূলক।
- ২লগইন করে কর প্রদানের অংশে যানলগইন করে 'ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান' অংশে যান। আগে যুক্ত করা হোল্ডিং থাকলে তালিকায় দেখাবে।
- ৩খতিয়ান যুক্ত করুনহোল্ডিং তালিকায় না থাকলে নতুন খতিয়ান যুক্ত করুন: বিভাগ, জেলা, উপজেলা আর মৌজা বেছে খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর দিন। শেষ দাখিলা বা নামজারি (খারিজ) খতিয়ান হাতের কাছে রাখুন, এসব তথ্য সেখানেই লেখা থাকে।
- ৪ভূমি অফিসের যাচাইয়ের অপেক্ষা করুনআপনার দেওয়া খতিয়ান ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা যাচাই করে হোল্ডিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। এটা অফিসের অনুমোদনের কাজ, তাই কিছুদিন লাগতে পারে। অনুমোদন হলে হোল্ডিং আপনার তালিকায় চলে আসে।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে (ইউডিসি) গিয়ে, অথবা ১৬১২২ নম্বরে ফোন করে নিবন্ধন করা যায়। পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে নতুন নিবন্ধন লাগে না, 'পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?' থেকে ওটিপি দিয়ে নতুন পাসওয়ার্ড দিন।
৩. করের অঙ্ক কীভাবে দেখায়, টাকা দেবেন কীভাবে
হোল্ডিং বেছে নিলে দাবির হিসাব দেখায়। কৃষি, আবাসিক, বাণিজ্যিক না শিল্প, জমির ব্যবহার অনুযায়ী সরকার হার ঠিক করে দেয়, আর অঙ্কটা সিস্টেম নিজেই হিসাব করে। দাবি ফরমে বছর বা অঙ্ক বেছে নিয়ে পরিশোধে যান।
| দাবিতে যা দেখায় | এর মানে |
|---|---|
| বকেয়া | আগের যে অর্থবছরগুলোর কর ৩০ জুনের মধ্যে দেওয়া হয়নি |
| হাল | চলতি অর্থবছরের কর, ৩০ জুন পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া |
| জরিমানা | টানা ৩ বছর বকেয়া থাকলে বছরে ৬.২৫ শতাংশ হারে |
| অগ্রিম | চাইলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কর আগেই |
অঙ্ক ঠিক থাকলে পেমেন্টে গিয়ে বিকাশ, রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং, ব্যাংক কার্ড বা সোনালী ব্যাংকের গেটওয়েতে টাকা দিন। পেমেন্ট পাতায় তখন যে মাধ্যমগুলো দেখায়, তার যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন।
আইন অনুযায়ী কর নির্ধারণের তালিকা প্রকাশ বা এসএমএস পাওয়ার ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে লিখিতভাবে বা অনলাইনে পুনরীক্ষণের আবেদন করা যায়। বসতবাড়িকে বাণিজ্যিক ধরার মতো ভুল দেখলে টাকা দেওয়ার আগে এই পথ নিন।
৪. দাখিলা নামানো আর যাচাই
টাকা জমা হলে দাখিলা নিজে থেকে তৈরি হয়। নামিয়ে PDF রেখে দিন, দরকারে প্রিন্ট নিন। আইন অনুযায়ী অনলাইনে পাওয়া দাখিলার প্রিন্ট প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, আর ইলেকট্রনিক দাখিলার সঙ্গেই তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকে।
- দাখিলায় একটি কিউআর কোড থাকে। সেটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের 'ভূমি' অ্যাপের কিউআর যাচাই অংশ দিয়ে স্ক্যান করুন।
- মন্ত্রণালয় অন্য কোনো কিউআর স্ক্যানার ব্যবহার না করতে বলেছে, কারণ জাল দাখিলায় আসল কোড নকল করে বসানোর ঘটনা ধরা পড়েছে।
- অ্যাপে দেখানো নাম, হোল্ডিং, টাকার অঙ্ক আর অর্থবছর কাগজের সঙ্গে না মিললে ১৬১২২ নম্বরে জানান।
- নামজারির আবেদনে সর্বশেষ দাখিলা আপলোড করতে হয়, তাই প্রতি বছরের দাখিলা গুছিয়ে রাখুন।
৫. হোল্ডিং খুঁজে না পেলে
- জমি কিনেছেন কিন্তু নামজারি হয়নি: খতিয়ানে এখনো আগের মালিকের নাম, তাই আপনার নামে হোল্ডিং হবে না। আগে নামজারি করুন, মঞ্জুর হলে নতুন হোল্ডিং তৈরি হয়।
- উত্তরাধিকারের জমি: ওয়ারিশরা আলাদা নামজারি না করা পর্যন্ত পুরো জমি একই খতিয়ানে ধরে কর হয়। তখন মৃত ব্যক্তির হোল্ডিং থেকে কর দিন।
- খতিয়ান যুক্ত করার আবেদন পেন্ডিং বা বাতিল: মৌজা, জরিপ বা খতিয়ান নম্বর ভুল হয়েছে কি না দেখুন। দাখিলা বা খতিয়ান দেখে ঠিক তথ্য দিয়ে আবার আবেদন করুন।
- একই মৌজায় আপনার একাধিক খতিয়ান: আইন অনুযায়ী একই মৌজার সব জমি একটি জমাবন্দিতে একত্র করে কর ধরা হয়, তাই আলাদা হোল্ডিং না দেখানোর কারণ এটাও হতে পারে।
- অনেক দিনেও সমাধান না হলে শেষ দাখিলা, খতিয়ান আর NID নিয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান, অথবা ১৬১২২ নম্বরে ফোন করুন।
এই অ্যাকাউন্ট থেকেই নামজারিসহ অন্য ভূমি সেবার আবেদন হয়। নিবন্ধনের ওটিপি বা পাসওয়ার্ড দোকানি বা দালালের হাতে দেবেন না।
৬. অনেকে যা জানতে চান
বিদেশ থেকে কি খাজনা দেওয়া যায়?
টাকা কেটে গেছে কিন্তু দাখিলা আসেনি, কী করব?
দাখিলা কি জমির মালিকানার প্রমাণ?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।