
সংক্ষেপে
কত বছর খাজনা না দিলে জমি খাস হয়, এমন কোনো মেয়াদ ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এ নেই। আইন বলছে, প্রতি বছরের কর ৩০ জুনের মধ্যে দিতে হয়, না দিলে তা বকেয়া। টানা ৩ বছর বকেয়া থাকলে প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত বছরে ৬.২৫% হারে জরিমানাসহ কর আদায় হয়, আর তৃতীয় বছর শেষে সার্টিফিকেট মামলা করা যায়।
সার্টিফিকেট মামলায় সম্পত্তি ক্রোক আর নিলামের বিধান আছে, তবে সেটা বকেয়া আদায়ের পথ, জমি সরকারের খাস হয়ে যাওয়া নয়। খাস হওয়ার কথা আছে প্রজাস্বত্ব আইনের ৯২ ধারায়, এবং সেখানে শর্ত শুধু খাজনা বাকি নয়।
খতিয়ান যুক্ত থাকলে বকেয়া দেখা, কর দেওয়া আর দাখিলা নামানো যায়।
এই লেখায়
১. কত বছর খাজনা না দিলে জমি খাস হয়: সোজা উত্তর
গ্রামে প্রায়ই শোনা যায়, তিন বছর খাজনা না দিলে জমি সরকার নিয়ে নেবে। ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ পুরোটা পড়লে দেখা যায়, খাজনা না দেওয়ার কারণে জমি খাস করার কোনো ধারা সেখানে নেই। আইনটি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে কার্যকর, পুরোনো ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশ বাতিল করে।
আইনে যা আছে তা হলো জরিমানা আর আদায়ের মামলা। এখানে ৩ বছর সংখ্যাটা আছে ঠিকই, তবে খাস হওয়ার জন্য নয়, জরিমানা শুরু আর মামলার সময় হিসেবে।
| অবস্থা | আইনে যা হয় |
|---|---|
| ৩০ জুনের মধ্যে কর দিলেন | কোনো জরিমানা নেই |
| ৩০ জুন পেরিয়ে গেল | সেই বছরের কর বকেয়া হিসেবে ধরা হয় |
| টানা ৩ বছর বকেয়া | প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত বছরে ৬.২৫% হারে জরিমানাসহ আদায়যোগ্য |
| তৃতীয় বছর শেষ | পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট, ১৯১৩ অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা করা যায় |
| মামলা চলাকালে জরিমানাসহ পরিশোধ | মামলা প্রত্যাহার করতে হয় |
| বহু বছর আগের বকেয়া | আইনে এই দাবি কখনো তামাদি হয় না |
২. সার্টিফিকেট মামলা হলে কী হতে পারে, জমি কি নিলাম হয়
সার্টিফিকেট মামলা মানে আদালতে না গিয়ে সরকারি পাওনা আদায়ের প্রশাসনিক পথ। পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্টের ১৪ ধারায় সার্টিফিকেট কর্মকর্তা কয়েকভাবে আদায়ের আদেশ দিতে পারেন: সম্পত্তি ক্রোক করে বা ক্রোক ছাড়াই বিক্রি, ডিক্রি ক্রোক, অথবা দেনাদারকে দেওয়ানি কারাগারে আটক।
একই আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী সার্টিফিকেটের নোটিশ জারির পর দেনাদার নিজের স্থাবর সম্পত্তি ব্যক্তিগতভাবে হস্তান্তর করলে তা পাওনা আদায়ের বিপক্ষে টেকে না। অর্থাৎ নোটিশ পাওয়ার পর জমি বেচে দায় এড়ানো যায় না।
কত বছর খাজনা না দিলে জমি নিলাম হয়, এর নির্দিষ্ট বছর আইনে লেখা নেই। তৃতীয় বছর শেষে মামলা করা যায়, আর মামলায় নিলামের বিধান আছে। নিলাম হলে জমি যায় ক্রেতার হাতে পাওনা আদায়ের জন্য, সরকারের খাস খতিয়ানে নয়।
৩. তাহলে খাস হওয়ার কথা আসে কোথা থেকে
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯২ ধারায় কয়েকটি অবস্থায় রায়তের স্বত্ব লোপ পাওয়ার কথা আছে। সম্ভবত এখান থেকেই তিন বছরের কথাটা ছড়িয়েছে। কিন্তু শর্তগুলো খাজনা বাকির চেয়ে অনেক বড়।
- রায়ত উইল ছাড়া মারা গেলেন এবং উত্তরাধিকার আইনে কোনো ওয়ারিশ নেই।
- নির্ধারিত নিয়মে নোটিশ দিয়ে রায়ত নিজেই জোত ছেড়ে দিলেন।
- খাজনা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা না রেখে রায়ত স্বেচ্ছায় বসতবাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন, এবং নিজে, পরিবার, শ্রমিক বা বর্গাদার দিয়েও টানা তিন বছর জমি চাষ করলেন না।
- উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলেন এমন কেউ যিনি প্রকৃত চাষি নন, এবং পর্যাপ্ত কারণ ছাড়া পাঁচ বছর কোনোভাবে জমি চাষ করালেন না।
এর কোনো একটি ঘটলেও রাজস্ব কর্মকর্তা সরাসরি জমি নিতে পারেন না। আগে নোটিশ প্রকাশ করে কারণ জানাতে হয়, আগ্রহী সবার আপত্তি শুনে সিদ্ধান্ত লিখতে হয়। শেষ শর্তের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৯০ দিনের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে পারেন। আপনি জমিতে থাকেন বা চাষ করান, শুধু খাজনা কয়েক বছর বাকি, এমন অবস্থায় এই ধারা খাটে না।
৪. খাজনা নিয়ে যে ভুলগুলো এড়াবেন
- জমি খাস হবে ভেবে আতঙ্কে দালালের কাছে টাকা দেবেন না। বকেয়ার অঙ্ক নিজে পোর্টালে বা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দেখে নিন।
- কর নির্ধারণের খুদে বার্তা এলে উপেক্ষা করবেন না। আইন অনুযায়ী এই এসএমএসই নোটিশ হিসেবে ধরা হয়, আর আপত্তির সময় মাত্র ১৫ কার্যদিবস।
- সার্টিফিকেটের নোটিশ পাওয়ার পর জমি বিক্রি করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করবেন না, পাওনা আদায়ের বিপক্ষে সেই হস্তান্তর টেকে না।
- ২৫ বিঘার কম কৃষিজমি বলে কিছুই করার নেই, এমন ভাববেন না। মওকুফ দাখিলা নিয়ে রাখলে দখলের প্রমাণ থাকে।
- প্রতিটি দাখিলা নামিয়ে বা প্রিন্ট করে রাখুন। জমি বিক্রি বা নামজারির সময় হালনাগাদ খাজনার প্রমাণ কাজে লাগে।
৫. বকেয়া খাজনা দেখবেন ও শোধ করবেন যেভাবে
- ১ldtax-এ অ্যাকাউন্ট খুলুনমোবাইল নম্বর আর NID দিয়ে নিবন্ধন করুন। আইন অনুযায়ী জমাবন্দির সঙ্গে মালিকের মোবাইল নম্বর আর NID যুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক।
- ২খতিয়ান বা হোল্ডিং যুক্ত করুনমৌজা আর খতিয়ান নম্বর দিয়ে নিজের জমি যোগ করুন। ইউনিয়ন ভূমি অফিস অনুমোদন দিলে দাবির অঙ্ক দেখা যায়।
- ৩বকেয়া আর জরিমানা মিলিয়ে নিনদাবির তালিকায় হাল বছর, বকেয়া বছর আর জরিমানা আলাদা দেখায় কি না দেখুন। অঙ্কে আপত্তি থাকলে পরের ধাপে যান।
- ৪আপত্তি থাকলে ১৫ কার্যদিবসে আবেদনকর নির্ধারণের খুদে বার্তা পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে পুনরীক্ষণের আবেদন করা যায়। তাঁর আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা কালেক্টরের কাছে আপিল।
- ৫অনলাইনে পরিশোধ করে দাখিলা রাখুনব্যাংক কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা দিন। ইলেকট্রনিক দাখিলায় যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকে, প্রিন্ট কপি প্রমাণ হিসেবে চলে।
চাইলে বকেয়া আর হাল করের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কর অগ্রিমও দিতে পারেন। কৃষিকাজে নির্ভরশীল পরিবারের মোট কৃষিজমি ২৫ বিঘা বা ৮.২৫ একর পর্যন্ত হলে কর মওকুফ, তবে দখলের প্রমাণ রাখতে নির্ধারিত ফি দিয়ে মওকুফ দাখিলা নিতে হয়।
৬. অনেকে যা জানতে চান
কত বছর খাজনা না দিলে জমি খাস হয়?
খাজনা না দিলে কি হয়?
কত বছর খাজনা না দিলে জমি নিলাম হয়?
অনেক বছর আগের বকেয়া খাজনা কি মাফ হয়ে যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২১ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।