ভূমি ও নামজারি

খাস জমি লিজ নেওয়ার নিয়ম: অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত কারা পান, কত টাকা লাগে, কে অনুমোদন দেন

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৭ মিনিট

হালনাগাদ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
খাস জমি লিজ নেওয়ার নিয়ম: অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত কারা পান, কত টাকা লাগে, কে অনুমোদন দেন

সংক্ষেপে

খাস জমি লিজ নেওয়ার নিয়ম বলতে সাধারণত যা বোঝানো হয়, সরকারি ভাষায় তা অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫ (সংশোধনসহ) অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু কাজে, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে এই জমি দেওয়া হয়, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দাম ধরা হয় বাজার দরে।

মসজিদ, মন্দির, এতিমখানা, কবরস্থান, শ্মশান আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পায় বাজার দরের ১০ শতাংশ দামে। রাস্তা, নদী, খাল, পুকুর, মাঠ বা কবরস্থানের মতো জনসাধারণের ব্যবহারের খাস জমি এবং হাট-বাজারের জমি এই নীতিমালায় বন্দোবস্ত হয় না।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা

অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর সংশোধিত কপি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা পাতায়।

নীতিমালা দেখুন
এই লেখায়
  1. অকৃষি খাস জমি কোনটা, আর কৃষি খাস জমির সঙ্গে তফাত
  2. কারা অকৃষি খাস জমি পান, কতটুকু আর কত টাকায়
  3. কোন খাস জমি কখনো লিজ বা বন্দোবস্ত হয় না
  4. অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্তের আবেদন যেভাবে এগোয়
  5. আবেদনের আগে নিজে যা মিলিয়ে নেবেন
  6. বন্দোবস্ত বাতিল হয় যে কারণে
  7. অনেকে যা জানতে চান

১. অকৃষি খাস জমি কোনটা, আর কৃষি খাস জমির সঙ্গে তফাত

উপজেলা সদরে বা পৌরসভায় সরকারি জমি পড়ে আছে, দোকান বা খামার করতে চান, তখনই প্রশ্নটা আসে। নীতিমালার ২.০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, চার মেট্রোপলিটন এলাকার সব পৌর এলাকা আর সব থানা সদর শহরাঞ্চল ধরা হবে, সেখানকার চাষযোগ্য খাস জমিও অকৃষি খাস জমি। শহরের বাইরে চাষযোগ্য জমি বাদে বাকি সব খাস জমি অকৃষি।

নীতিমালা শুধু জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড হওয়া খাস জমির ক্ষেত্রে খাটে, অন্য দপ্তরের নামে রেকর্ড করা সরকারি জমির ক্ষেত্রে নয়। ভূমিহীন পরিবারের জন্য কৃষি খাস জমি বন্দোবস্তের নিয়ম আলাদা, সেটা নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে। রাঙামাটি, বান্দরবান আর খাগড়াছড়িতে এই নীতিমালা চলে না, সেখানে বিশেষ আইন আর সরকারি নির্দেশ প্রযোজ্য।

২. কারা অকৃষি খাস জমি পান, কতটুকু আর কত টাকায়

কে বা কোন কাজেজমির সীমাদাম বা শর্ত
সরকারি দপ্তর বা সংস্থাপ্রয়োজনমতোবাজার দর
মসজিদ-মন্দির, এতিমখানা, কবরস্থান, শ্মশানপরিমাণমতোবাজার দরের ১০%
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপরিমাণমতোনির্ধারিত মূল্যের ১০%
৫ বছরের বেশি একসনা লিজে দখলে থাকা, সরকারি পাওনা নিয়মিত দেওয়া ব্যক্তিসর্বোচ্চ ০.০৫ একরবাজার দর
শহরের বাইরে হাঁস-মুরগির খামারসর্বোচ্চ ২ একরপ্রথমে ১০ বছরের জন্য, প্রকল্প অনুমোদন লাগে
শহরের বাইরে গবাদিপশু বা দুগ্ধ খামারসর্বোচ্চ ৫ একরপ্রথমে ১০ বছরের জন্য, প্রকল্প অনুমোদন লাগে
শহরের বাইরে শিল্প, নিজে ৩/৪ জমি জোগাড় করলেপ্রয়োজনের সর্বোচ্চ ১/৪বাজার দর
ফলের বাগানসর্বোচ্চ ১৫ একরদীর্ঘমেয়াদি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে
প্রবাসীদের নিবন্ধিত সমবায়, অন্তত ৫ তলা ভবনমেট্রোপলিটনে ১ একর, জেলা শহরে ৩ একর পর্যন্তপুরো মূল্য বৈদেশিক মুদ্রায়
অধিগ্রহণের পর খাস হওয়া জমির মূল মালিক, ক্ষতিপূরণ না নিয়ে থাকলেমেট্রোপলিটনে ০.০৮, জেলা-থানা সদর ও পৌর এলাকায় ০.১৬, বাইরে ০.৩২ একরবাজার দর, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে
রপ্তানির জন্য ফুল চাষসর্বোচ্চ ৫ একরদীর্ঘমেয়াদি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে
রাবার, বাঁশ, বেত, পাটি ও পাতি গাছব্যক্তি ৩০ একর, নিবন্ধিত পাবলিক লিমিটেড ১০০ একরদীর্ঘমেয়াদি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে
ঔষধি বৃক্ষব্যক্তি ৫ একর, পাবলিক লিমিটেড ১০ একরদীর্ঘমেয়াদি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে

খামারের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুমোদন করতে হয়। প্রথম ৫ বছরে প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে আর শর্ত মানলে একই জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তে বদলানো যায়। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও সরকার পুনর্বাসিত পরিবার সর্বোচ্চ ০.০৫ একর পেতে পারে, তবে ঢাকা (নারায়ণগঞ্জসহ) আর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় নয়।

এই তালিকার বাইরে শহর এলাকার অন্য সব খাস জমি নীতিমালার ৩.০(থ) অনুযায়ী নিলামে সেলামি ঠিক করে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তাই খাস জমি লিজ নিতে কত টাকা লাগে, তার একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক নেই। জেলা প্রশাসক প্রতিটি কেসে সেলামি ঠিক করেন।

৩. কোন খাস জমি কখনো লিজ বা বন্দোবস্ত হয় না

  • খাস খতিয়ানে রেকর্ড করা জনগণের ব্যবহারের রাস্তা, ঘাট, নদী, খাল, নালা, পয়ঃপ্রণালী, পুকুর, বাঁধ, কবরস্থান, শ্মশান, পার্ক আর খেলার মাঠ।
  • ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের এলাকাধীন জমি।
  • হাট-বাজারের জমি।
  • বন আইনের ৪ ধারায় গেজেট হওয়া জমি আর ২৯ ধারার রক্ষিত বনভূমি, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ছাড়া।
দালালের প্রতিশ্রুতিতে টাকা দেবেন না

মেট্রোপলিটন এলাকায় নিলাম ছাড়া যেকোনো বন্দোবস্তে সরকার প্রধানের অনুমোদন লাগে। তাই কেউ টাকা নিয়ে দ্রুত খাস জমি পাইয়ে দেওয়ার কথা বললে সাবধান থাকুন, আর ভূমি সেবার হটলাইন ১৬১২২-এ জানাতে পারেন।

৪. অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্তের আবেদন যেভাবে এগোয়

  • ১
    জমি চিহ্নিত করুনদাগ নম্বর ধরে খতিয়ান দেখে নিশ্চিত হোন জমিটি ১ নম্বর খাস খতিয়ানে জেলা প্রশাসকের নামে আছে।
  • ২
    জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদনউদ্দেশ্য, জমির পরিমাণ আর প্রকল্পের কাগজসহ আবেদন করুন। সরকারি নির্ধারিত আবেদন ফরম অনলাইনে পাওয়া যায়নি, তাই রাজস্ব শাখা থেকে ফরম ও কাগজের তালিকা জেনে নিন।
  • ৩
    কেস রেকর্ড আর সেলামিনীতিমালার ৪.০(গ) অনুযায়ী জেলা প্রশাসক সেলামি ঠিক করে কেস রেকর্ড তৈরি করে প্রস্তাব পাঠান।
  • ৪
    অনুমোদনজেলা শহরে ০.০৮ একর, থানা সদরে ০.১৬ একর আর এর বাইরে ০.৩০ একরের বেশি হলে ভূমি সংস্কার বোর্ডের অনুমোদন লাগে। কম হলে বিভাগীয় কমিশনার চূড়ান্ত করেন।
  • ৫
    মূল্য পরিশোধ ও খতিয়ানসময়মতো দাম দিন। দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত হলে জেলা প্রশাসক আলাদা খতিয়ান খোলেন, আর দখলের দিন থেকে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয়।

৫. আবেদনের আগে নিজে যা মিলিয়ে নেবেন

বাজারের পাশে খালি জায়গা দেখে অনেকে ধরে নেন সেটা খাস। কিন্তু জমিটা সড়ক বিভাগ, রেলওয়ে বা পৌরসভার নামে রেকর্ড থাকলে এই নীতিমালায় আবেদনই চলবে না। তাই আগে কাগজে নিশ্চিত হোন।

আবেদনের আগে

৬. বন্দোবস্ত বাতিল হয় যে কারণে

নীতিমালার ৫.০ অনুচ্ছেদে বাতিলের কারণ লেখা আছে। ধরুন, ফেনীর একজন উদ্যোক্তা দুগ্ধ খামারের জন্য জমি পেয়ে সেখানে দোকান ভাড়া দিলেন। অনুমতি ছাড়া উদ্দেশ্য বদলানোয় বন্দোবস্ত বাতিল হতে পারে।

  • অনুমতি ছাড়া অন্য কাজে জমি ব্যবহার।
  • চুক্তিপত্রের কোনো শর্ত ভঙ্গ।
  • ভূমি আইন বা সরকারি আদেশ লঙ্ঘন।
  • নির্দিষ্ট সময়ে দাম না দেওয়া। কিস্তিতে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে কিস্তি খেলাপ করলে বন্দোবস্ত বাতিল হয়, দেওয়া কিস্তির টাকাও বাজেয়াপ্ত হয়।
  • তথ্য গোপন করে বন্দোবস্ত নেওয়া।

৭. অনেকে যা জানতে চান

সরকারি খাস জমি লিজ নিতে কত টাকা লাগে?
নির্দিষ্ট অঙ্ক নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাজার দর, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত মূল্যের ১০ শতাংশ। শহরের অন্য খাস জমি নিলামে সেলামি ঠিক করে দেওয়া হয়।
খাস জমি কিভাবে লিজ নিতে হয়?
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখায় উদ্দেশ্য আর কাগজসহ আবেদন করতে হয়। জেলা প্রশাসক সেলামি ঠিক করে প্রস্তাব পাঠান, জমির পরিমাণ অনুযায়ী বিভাগীয় কমিশনার বা ভূমি সংস্কার বোর্ড অনুমোদন দেয়।
khas pukur ba khas rasta ki lease neya jay?
অকৃষি খাসজমি নীতিমালায় যায় না। খাস খতিয়ানে রেকর্ড করা জনগণের ব্যবহারের রাস্তা, পুকুর, খাল, মাঠ, কবরস্থানের মতো জমি এই নীতিমালায় বন্দোবস্তের আওতায় আসে না।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন