
সংক্ষেপে
দলিলে নামের বানান, বাবার নাম, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর বা মৌজার নাম ভুল ধরা পড়লে দুই পথ আছে। দাতা আর গ্রহীতা দুজনই রাজি থাকলে একটি ভ্রম সংশোধন দলিল লিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করাতে হয়। নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফি তালিকায় এর স্ট্যাম্প শুল্ক ৩০০ টাকা, সঙ্গে হলফনামার ৩০০ টাকা, আর দলিলটি উভয় পক্ষকে সম্পাদন করতে হয়।
অন্য পক্ষ রাজি না হলে, মারা গেলে বা ভুলটা প্রতারণার কারণে হলে পথ দেওয়ানি আদালতে দলিল সংশোধনের মামলা। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারায় এই মামলার কথা বলা আছে। বিরোধ থাকলে কাগজ নিয়ে এসি ল্যান্ড অফিস বা একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
ভ্রম সংশোধনপত্রসহ সব ধরনের দলিলের স্ট্যাম্প শুল্ক আর রেজিস্ট্রেশন ফির সরকারি তালিকা এখানে।
এই লেখায়
১. দলিলে কোন ভুল কতটা গুরুতর
সব ভুল এক রকম নয়। বানানের ছোট ভুল আর জমির পরিমাণ বা দাগ নম্বরের ভুলের ঝুঁকি আলাদা। দাগ নম্বর ভুল থাকলে কাগজে দেখা যায় আপনি এমন জমি কিনেছেন যা আসলে কেনেননি। পরে নামজারি আটকে যায়, আর জমি বিক্রির সময় ক্রেতা আপত্তি তোলেন।
| ভুল কোথায় | উদাহরণ | সাধারণ পথ |
|---|---|---|
| নাম বা বাবার নাম | রহিম উদ্দিন লেখা হয়েছে রহিম উদ্দীন | দুই পক্ষ মিলে ভ্রম সংশোধন দলিল |
| দাগ বা খতিয়ান নম্বর | ৪১২ নম্বর দাগের জায়গায় ৪২১ লেখা | ভ্রম সংশোধন দলিল; রাজি না হলে মামলা |
| মৌজা বা জেএল নম্বর | পাশের মৌজার নাম বসে গেছে | ভ্রম সংশোধন দলিল; প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ |
| জমির পরিমাণ বা দাম | ১০ শতাংশের জায়গায় ১৫ শতাংশ | দুই পক্ষ একমত না হলে আদালত |
| দলিলে নয়, খতিয়ানে ভুল | দলিল ঠিক, নামজারি খতিয়ানে নাম ভুল | এসি ল্যান্ড অফিসে খতিয়ান সংশোধন |
ভুল সাধারণত ধরা পড়ে তিনটি সময়ে: নামজারির শুনানিতে, ব্যাংকে জমি বন্ধক রাখতে গেলে, অথবা জমি বিক্রির সময় ক্রেতার আইনজীবী কাগজ মেলালে। তাই মূল দলিল হাতে পাওয়ার দিনই খতিয়ান পাশে রেখে নাম, দাগ, খতিয়ান, মৌজা আর পরিমাণ একবার মিলিয়ে নিন। এখন ধরা পড়লে বিক্রেতাকে পাওয়া সহজ, কয়েক বছর পরে কঠিন।
শেষ সারিটা খেয়াল করুন। অনেকে খতিয়ানের ভুলকে দলিলের ভুল ভাবেন। দলিল ঠিক থাকলে দলিল বদলানোর দরকার নেই। তখন কাজটা ভূমি অফিসের, সেই পথ আমাদের খতিয়ান সংশোধন নিয়ে লেখায় আছে।
২. ভ্রম সংশোধন দলিল করবেন যেভাবে
রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়া দলিলে কলম চালিয়ে কিছু বদলানো যায় না। ভুল ঠিক করতে হয় নতুন একটি দলিল দিয়ে, যেখানে আগের দলিলের নম্বর আর তারিখ উল্লেখ করে লেখা হয় কোন শব্দ বা সংখ্যার জায়গায় কী হবে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের তালিকায় এর নাম ভ্রম সংশোধনপত্র।
- ১ভুলটা প্রমাণসহ চিহ্নিত করুনদলিলের কোন পাতায় কী ভুল, তা লিখে রাখুন। সঠিক তথ্যের প্রমাণ জোগাড় করুন: নামের জন্য NID, দাগ বা খতিয়ানের জন্য সর্বশেষ খতিয়ান আর বায়া দলিল।
- ২দাতাকে রাজি করানএই দলিল দুই পক্ষকেই সম্পাদন করতে হয়। বিক্রেতা বা দাতা মারা গেলে তাঁর ওয়ারিশদের কাছে যেতে হতে পারে। কারা সই করবেন, তা দলিল লেখক বা আইনজীবীর সঙ্গে ঠিক করুন।
- ৩দলিল লেখানমূল দলিলের নম্বর, তারিখ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস আর ভুল ও সঠিক তথ্য পাশাপাশি লেখা হবে। জমির পরিমাণ বা দাম বদলের মতো বড় পরিবর্তন এই দলিলে ঢোকানো ঠিক নয়, এতে নতুন হস্তান্তরের প্রশ্ন ওঠে।
- ৪সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিযে অফিসে মূল দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সাধারণত সেখানেই জমা দিন। দুই পক্ষ উপস্থিত থেকে সই আর টিপসই দেবেন। ফি জমার রসিদ রাখুন।
- ৫নতুন দলিলের মূল কপি তুলে রাখুনরেজিস্ট্রির পর রশিদ দেখিয়ে মূল কপি তুলুন। এখন থেকে আগের দলিলের সঙ্গে এটিও একসঙ্গে রাখতে হবে, বিক্রি বা নামজারির সময় দুটোই লাগবে।
৩. ভ্রম সংশোধন দলিলের খরচ কত
নিবন্ধন অধিদপ্তরের সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে হালনাগাদ করা ফি তালিকায় ভ্রম সংশোধনপত্রের খরচ বেশ কম, কারণ এতে জমির দামের ওপর শতাংশ হারে কিছু ধরা হয় না। তালিকা অনুযায়ী এতে স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর বা ভ্যাট প্রযোজ্য নয়।
| খাত | টাকা |
|---|---|
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ৩০০ |
| হলফনামার স্ট্যাম্প | ৩০০ |
| ই ফি | ১০০ |
| এন ফি | ৩০০ শব্দের প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ |
| এনএন ফি আর কোর্ট ফি | সাফ কবলার মতো, প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ আর ১০ |
ধরুন দলিলটি ৪ পৃষ্ঠার। তাহলে সরকারি খরচ মোটামুটি ৩০০ + ৩০০ + ১০০ + ৯৬ + ১৪৪ + ১০, অর্থাৎ ৯৫০ টাকার কাছাকাছি। দলিল লেখকের পারিশ্রমিক আলাদা। অফিস কোনো খাতে বাড়তি টাকা চাইলে রসিদ চেয়ে নিন, আর ফি তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।
৪. দাতা রাজি না হলে: দলিল সংশোধনের মামলা
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ৩১ ধারা বলছে, প্রতারণা বা দুই পক্ষের যৌথ ভুলের কারণে কোনো লিখিত দলিল যদি তাঁদের আসল ইচ্ছা প্রকাশ না করে, তাহলে যেকোনো পক্ষ বা তাঁর স্বার্থের প্রতিনিধি দলিল সংশোধনের মামলা করতে পারেন। আদালত ভুল বা প্রতারণা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হলে দলিল সংশোধন করতে পারেন। তবে সরল বিশ্বাসে টাকা দিয়ে অধিকার পাওয়া তৃতীয় কারও ক্ষতি করে এই সংশোধন হয় না।
- বিক্রেতা সই দিতে অস্বীকার করলে বা যোগাযোগ বন্ধ করলে
- বিক্রেতা মারা গেছেন, ওয়ারিশরা একমত নন
- দাগ বা পরিমাণের ভুল নিয়ে দুই পক্ষের দাবি আলাদা
- জমিটি এর মধ্যে আবার অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়ে গেছে
এই মামলায় তামাদির সময়সীমা প্রযোজ্য, আর সময়টা কবে থেকে গোনা হবে তা ঘটনার ওপর নির্ভর করে। আমরা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। ভুল জানার পরপরই কাগজ নিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. দলিল ঠিক হওয়ার পর খতিয়ান মিলিয়ে নিন
দলিল সংশোধনের পর কাজ শেষ নয়। ভুল দলিল দিয়ে যদি আগেই নামজারি হয়ে থাকে, তাহলে খতিয়ানেও ভুল ঢুকে গেছে। সংশোধিত দলিল দেখিয়ে খতিয়ান ঠিক করাতে হবে।
যা মিলিয়ে দেখবেন
৬. অনেকে যা জানতে চান
দলিলে নাম ভুল হলে করণীয় কী?
দলিলে দাগ নম্বর ভুল হলে করণীয় কি?
ভ্রম সংশোধন দলিল করতে কত টাকা লাগে?
দলিল সংশোধন মামলার তামাদি কত দিন?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।