
সংক্ষেপে
মুসলিম আইনের হেবা বা দানের ঘোষণাপত্র নিবন্ধন আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করতেই হয়। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি, আর আপন ভাই-বোনের মধ্যে হেবা হলে জমির দাম যত হোক, নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা। বিডিলজে থাকা স্ট্যাম্প আইনের তফসিলে এমন হেবার স্ট্যাম্প শুল্ক ১,০০০ টাকা, অন্য কাউকে দান করলে দলিলে লেখা মূল্যের ১.৫ শতাংশ।
২০২৬ সালে দুটি বদল এসেছে। ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে হেবা দলিলেও বিক্রির দলিলের মতো দাতার নামে হালনাগাদ খতিয়ান, নকশা, ২৫ বছরের মালিকানার বিবরণ আর হলফনামা লাগে। আর ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বাবা-মা, সন্তান, নাতি-নাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাতার আজীবন ভোগের অধিকার রেখে দান করা যায়।
হেবা ও দানের দলিলে কোন কাগজ যুক্ত না থাকলে রেজিস্ট্রি হবে না, আইনের মূল পাঠ।
এই লেখায়
১. আইনে হেবা আর রেজিস্ট্রির বাধ্যবাধকতা
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২ ধারায় দান মানে স্বেচ্ছায়, বিনিময় ছাড়া কোনো সম্পত্তি একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে হস্তান্তর, যা গ্রহীতা বা তাঁর পক্ষে কেউ গ্রহণ করেছেন। ১২৩ ধারায় ২০০৪ সালে যোগ হয়েছে, মুসলিম আইনের হেবাকেও স্থাবর সম্পত্তির দান হিসেবে ধরা হবে। ফলে হেবা করতে হয় রেজিস্ট্রি করা দলিলে, দাতার স্বাক্ষর আর অন্তত দুজন সাক্ষীর সত্যায়নসহ।
নিবন্ধন আইনের ১৭ ধারাও একই কথা বলে: স্থাবর সম্পত্তির দানের দলিল, মুসলিম আইনের হেবার ঘোষণাপত্র আর হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ব্যক্তিগত আইনে দানের ঘোষণাপত্র বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রি করতে হয়। মুখে বলা হেবা বা সাদা কাগজে লেখা দানপত্র দিয়ে নামজারি বা খতিয়ানে নাম তোলার ভরসা করবেন না।
২. খরচ কত: নিবন্ধন ফি আর স্ট্যাম্প শুল্ক
| যার মধ্যে হেবা | নিবন্ধন ফি | স্ট্যাম্প শুল্ক |
|---|---|---|
| স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি, আপন ভাই, আপন বোন, আপন ভাই-বোন | ১০০ টাকা, জমির মূল্য যা-ই হোক | ১,০০০ টাকা |
| এর বাইরে অন্য যে কেউ | সরকারের সাধারণ ফি তালিকা অনুযায়ী | দলিলে লেখা সম্পত্তির মূল্যের ১.৫% |
১০০ টাকার নিবন্ধন ফি আসে নিবন্ধন আইনের ৭৮ক ধারা থেকে। হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ব্যক্তিগত আইনে একই আত্মীয়দের মধ্যে দানে, যদি সেই আইন দানের অনুমতি দেয়, তাতেও একই ১০০ টাকা। স্ট্যাম্প শুল্কের অঙ্ক বিডিলজে থাকা স্ট্যাম্প আইনের প্রথম তফসিলের ৩২ নম্বর ক্রমিক থেকে নেওয়া, যে তফসিল সর্বশেষ ২০২২ সালে হালনাগাদ করে রাখা হয়েছে। প্রতি বছরের অর্থ আইনে স্ট্যাম্প শুল্ক বদলাতে পারে।
হলফনামার স্ট্যাম্প, ই-ফি, নকলনবিশের ফি বা স্থানীয় সরকারের করের মতো খরচ জমির এলাকা আর দলিলের ধরন অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। মোট খরচ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ফি তালিকা দেখে বা দলিল লেখকের কাছ থেকে লিখিত হিসাব নিয়ে মিলিয়ে নিন।
৩. ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে: দাতার নামে খতিয়ান ছাড়া হেবা রেজিস্ট্রি নয়
নিবন্ধন (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে নিবন্ধন আইনের ৫২ক ধারা এখন বিক্রির দলিলের পাশাপাশি দান আর হেবার ঘোষণাপত্রেও খাটে। বিডিলজের টীকা অনুযায়ী এই অংশ ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর। নিচের বিবরণ দলিলে না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার হেবা দলিল রেজিস্ট্রি করবেন না:
- দাতা কিনে বা অন্যভাবে মালিক হলে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে তৈরি সর্বশেষ খতিয়ান, দাতার নামে।
- দাতা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হলে সর্বশেষ খতিয়ান দাতা বা তাঁর পূর্বসূরির নামে।
- সম্পত্তির ধরন আর মূল্য।
- চৌহদ্দি ও সীমানাসহ জমির নকশা।
- গত ২৫ বছরের মালিকানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
- দাতার হলফনামা যে তিনি আগে এই জমি কাউকে হস্তান্তর করেননি এবং এর বৈধ মালিক।
দাতা জমি কিনে থাকলে খতিয়ান তাঁর নিজের নামে লাগবে। কেনা জমির নামজারি না হয়ে থাকলে আগে নামজারি করিয়ে নিজের নামে খতিয়ান নিন, তারপর হেবা দলিল করুন।
৪. ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে: আজীবন ভোগের অধিকার রেখে দান
অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানকে জমি লিখে দিতে চান, কিন্তু বেঁচে থাকা পর্যন্ত নিজে সেই বাড়িতে থাকতে বা জমির ফসল নিতে চান। সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এর জন্য নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যোগ করেছে। আইনের মূল বিধানগুলো এমন:
- দাতা নিজের আজীবন ভোগের অধিকার রেখে অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি দান করতে পারবেন, অন্য আইনে যা-ই থাকুক।
- এমন দান হতে হবে বাবা-মা বা দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছ থেকে সন্তান বা নাতি-নাতনিকে, অথবা উল্টো দিকে, কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।
- স্থাবর সম্পত্তির বেলায় ঘোষণাটি দিতে হবে নিবন্ধন আইনের ১৭(১)(ক) ধারায় রেজিস্ট্রি করা দলিলে।
- দাতার আগে গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে যাবে, তবে দাতার আজীবন ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।
- এটি একটি আলাদা ধরনের হস্তান্তর; সাধারণ দান বা হেবার বৈধতা এতে কমে না।
রেজিস্ট্রির পর এই দান অপরিবর্তনীয়। শুধু দুটি পথ খোলা: আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য প্রকৃত প্রয়োজনে দাতা ও গ্রহীতা দুজনের সম্মতিতে রেজিস্ট্রি করা দলিলে বদল বা বাতিল; অথবা নাবালকত্ব, নিখোঁজ থাকা, মানসিক অসুস্থতা বা আইনি অক্ষমতার কারণে একজনের সম্মতি পাওয়া না গেলে অন্যজনের আবেদনে জেলা জজের অনুমতি। জেলা জজ সব পক্ষকে নোটিশ দিয়ে, তদন্ত করে আর আবেদন সৎ উদ্দেশ্যে কি না দেখে তবেই আদেশ দেন।
৫. হেবা দলিল থেকে নামজারি পর্যন্ত ধাপ
- ১খতিয়ান আর খাজনা হালনাগাদদাতার নামে বা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে পূর্বসূরির নামে সর্বশেষ খতিয়ান তুলুন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে দাখিলা রাখুন।
- ২দলিলের খসড়াদলিল লেখক বা আইনজীবীকে দিয়ে খসড়া করান। দাগ, খতিয়ান, জমির পরিমাণ, চৌহদ্দি, নকশা আর ২৫ বছরের মালিকানার বিবরণ যেন ঠিক থাকে। আজীবন ভোগ রাখতে চাইলে সেটি দলিলে স্পষ্ট করে লেখান।
- ৩হলফনামা আর সাক্ষীদাতার হলফনামা প্রস্তুত করুন, আর রেজিস্ট্রির দিন অন্তত দুজন সাক্ষী নিয়ে যান। সবার জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।
- ৪সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিদাতা ও গ্রহীতা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিল সম্পাদন করবেন, নির্ধারিত ফি ও স্ট্যাম্প শুল্ক দেবেন। রসিদ আর দলিলের নম্বর লিখে রাখুন।
- ৫গ্রহীতার নামে নামজারিরেজিস্ট্রির পর গ্রহীতা mutation.land.gov.bd-তে ই-নামজারির আবেদন করবেন, মালিকানার সূত্র হিসেবে হেবা বেছে। নামজারি না হলে গ্রহীতার নামে খতিয়ান বা খাজনার হোল্ডিং হয় না।
যা সঙ্গে রাখবেন
৬. হেবা কি বাতিল করা যায়
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৬ ধারা অনুযায়ী দাতা আর গ্রহীতা আগে থেকে একমত হলে এমন কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় দান স্থগিত বা বাতিল হতে পারে, যা দাতার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। আবার চুক্তি হলে যেসব কারণে তা বাতিলযোগ্য হতো, সেসব কারণেও দান বাতিল হতে পারে। এর বাইরে দান বাতিল হয় না। দাতা শুধু নিজের ইচ্ছায় যখন খুশি ফিরিয়ে নিতে পারবেন, এমন শর্ত রাখলে সেই অংশ বাতিল বলে গণ্য।
হেবা বাতিল, প্রতারণা বা জোর করে দলিল করানোর অভিযোগ আদালতের বিষয়। নিজের ক্ষেত্রে কোন পথ খাটে, তা আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করুন। নামজারি বা খতিয়ান নিয়ে প্রশ্নে উপজেলা ভূমি অফিসে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
৭. অনেকে যা জানতে চান
হেবা দলিল কাকে দেওয়া যায়?
বাবা জমি কিনেছিলেন, নামজারি হয়নি; এখন কি হেবা করতে পারবেন?
হেবা দলিলের খরচ কত ২০২৬?
জীবিত থাকতে নিজে ভোগ করার শর্তে কি জমি দেওয়া যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।