ভূমি ও নামজারি

ওয়াকফ সম্পত্তি কি বিক্রি করা যায়: প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর অবৈধ, সাব-রেজিস্ট্রার দলিলও করবেন না

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
ওয়াকফ সম্পত্তি কি বিক্রি করা যায়: প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর অবৈধ, সাব-রেজিস্ট্রার দলিলও করবেন না

সংক্ষেপে

ওয়াকফ সম্পত্তি সাধারণ জমির মতো বেচাকেনা করা যায় না। ওয়াকফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২-এর ৫৬ ধারা অনুযায়ী মোতাওয়াল্লি ওয়াকফের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, দান, বন্ধক, বিনিময় বা ৫ বছরের বেশি মেয়াদে ইজারা দিলে ওয়াকফ প্রশাসকের পূর্বানুমতি ছাড়া তা বৈধ হয় না। অনুমতি পেলেও অন্য আইনে অবৈধ হস্তান্তর বৈধ হয়ে যায় না।

২০১৩ সালের সংশোধনীতে যোগ হওয়া ৫৭ক ধারা অনুযায়ী প্রশাসক বা সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রার ওয়াকফ সম্পত্তির হস্তান্তর দলিল রেজিস্ট্রি করবেন না। অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর হলে প্রশাসক দেওয়ানি আদালতে সেটি বাতিল ঘোষণার আবেদন করতে পারেন।

ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়

ওয়াকফ এস্টেট তালিকাভুক্তি আর হস্তান্তরের অনুমতির খোঁজ নিন প্রশাসকের কার্যালয়ে।

ওয়েবসাইটে যান
এই লেখায়
  1. ওয়াকফ সম্পত্তি কি, মালিক কে
  2. ওয়াকফ সম্পত্তি কি বিক্রি করা যায়: ৫৬ ধারার শর্ত
  3. ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রির নিয়ম: অনুমতির আবেদন যেভাবে
  4. ওয়াকফ সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা
  5. অনুমতি ছাড়া কেনা হলে কী হয়, কেনার আগে কী দেখবেন
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. ওয়াকফ সম্পত্তি কি, মালিক কে

অধ্যাদেশের সংজ্ঞায় ওয়াকফ হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বী কোনো ব্যক্তির অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি মুসলিম আইনে স্বীকৃত ধর্মীয়, পুণ্য বা দাতব্য উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করা। দীর্ঘদিন ধরে মসজিদ, ঈদগাহ বা কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসা সম্পত্তিও ব্যবহারের ভিত্তিতে ওয়াকফ হতে পারে।

ওয়াকফ সম্পত্তি দেখাশোনা করেন মোতাওয়াল্লি। তিনি ব্যবস্থাপক, মালিকের মতো ইচ্ছামতো বেচতে পারেন না। মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থানের মতো সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান সম্পত্তির আয় পায়। পুরো ব্যবস্থার তদারকিতে আছেন সরকার নিযুক্ত ওয়াকফ প্রশাসক।

আইনের সংজ্ঞায় ওয়াকফ মানে সম্পত্তি স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করা। তাই কেউ ওয়ারিশ সূত্রে মালিক দাবি করে ওয়াকফ জমি বেচতে চাইলে আগে ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে জমিটি ওয়াকফ তালিকাভুক্ত কি না যাচাই করুন, আর মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

কোনটা ওয়াকফ, সন্দেহ হলে

৫০ ধারা অনুযায়ী কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ কি না, সেই প্রশ্নের সিদ্ধান্ত দেন ওয়াকফ প্রশাসক। সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ মোতাওয়াল্লি বা অন্য কেউ ৩ মাসের মধ্যে জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারেন।

২. ওয়াকফ সম্পত্তি কি বিক্রি করা যায়: ৫৬ ধারার শর্ত

মূল কথা হলো, অনুমতি ছাড়া নয়। ৫৬ ধারার প্রথম উপধারা মোতাওয়াল্লির নিচের কাজগুলোকে প্রশাসকের পূর্বানুমতির শর্তে বেঁধেছে।

কাজপ্রশাসকের পূর্বানুমতি লাগে কি
বিক্রিহ্যাঁ
দানহ্যাঁ
বন্ধকহ্যাঁ
বিনিময়হ্যাঁ
৫ বছরের বেশি মেয়াদে ইজারাহ্যাঁ
আদালত-নিযুক্ত রিসিভারের হস্তান্তরআদালত অনুমতি দেবে না, যদি না প্রশাসকের পূর্বানুমতি থাকে
  • অনুমতি থাকলেও অন্য আইনে অবৈধ বা অন্যভাবে অগ্রহণযোগ্য হস্তান্তর বৈধ হয় না।
  • অনুমতি ছাড়া হস্তান্তরের পর মোতাওয়াল্লি নিজে সম্পত্তির মালিক হয়ে গেলে প্রশাসকের নির্দেশে তা ওয়াকফকে ফেরত দিতে হবে।
  • অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর মোতাওয়াল্লির অসদাচরণ ও বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে গণ্য।

৩. ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রির নিয়ম: অনুমতির আবেদন যেভাবে

৫৭ ধারা অনুযায়ী মোতাওয়াল্লি বা রিসিভার হস্তান্তরের অনুমতি চেয়ে প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। ক্রেতা নিজে এই আবেদন করেন না, তাই ক্রেতার কাজ হলো অনুমতির আদেশ দেখে নেওয়া।

  • ১
    মোতাওয়াল্লির আবেদনকোন সম্পত্তি, কেন হস্তান্তর, কার কাছে আর কত মূল্যে, তা উল্লেখ করে ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন।
  • ২
    তদন্ত ও নোটিশপ্রশাসক প্রয়োজনমতো তদন্ত করেন আর যাঁদের উপযুক্ত মনে করেন তাঁদের নোটিশ দেন।
  • ৩
    শুনানিনোটিশ পাওয়া কেউ বক্তব্য দিতে চাইলে প্রশাসক শুনানি নেন।
  • ৪
    শর্তসহ অনুমতিপ্রশাসক নিজের বিবেচনায় শর্ত দিয়ে অনুমতি দিতে পারেন। ওয়াকফ দলিলেই হস্তান্তরের স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া থাকলে তিনি অনুমতি দিতে অস্বীকার করবেন না।
  • ৫
    রেজিস্ট্রিঅনুমতির আদেশসহ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল। ৫৭ক ধারায় অনুমতি ছাড়া রেজিস্ট্রি নিষেধ।

এর বাইরে ৩৩ ধারায় প্রশাসক নিজেও সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে ওয়াকফ সম্পত্তির কোনো অংশ বিক্রি, বন্ধক, বিনিময় বা ইজারা দিতে পারেন, তবে শুধু যদি তা ওয়াকফের উন্নয়ন ও সুবিধার জন্য প্রয়োজন মনে করেন।

৪. ওয়াকফ সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা

গ্রামে বা শহরে ওয়াকফ জমি নিয়ে কয়েকটি কথা প্রায়ই শোনা যায়, যার সঙ্গে আইনের মিল নেই। কেনা-বেচার আগে এগুলো আলাদা করে বুঝে নিন।

যা শোনা যায়আইন কী বলে
মোতাওয়াল্লি রাজি থাকলেই জমি বেচা যায়না, ৫৬ ধারায় প্রশাসকের পূর্বানুমতি ছাড়া বিক্রি বৈধ নয়
দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে আর ঝামেলা নেইনা, ৫৭ক ধারায় অনুমতি ছাড়া রেজিস্ট্রিই নিষেধ, আর প্রশাসক আদালতে বাতিলের আবেদন করতে পারেন
দীর্ঘমেয়াদে ভাড়া দিলে অনুমতি লাগে না৫ বছরের বেশি মেয়াদের ইজারায় পূর্বানুমতি লাগে
কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হলেই যথেষ্টমসজিদ বা মাদ্রাসা কমিটির সিদ্ধান্ত প্রশাসকের অনুমতির বিকল্প নয়

মসজিদের উন্নয়নের জন্য টাকা দরকার, তাই পাশের ওয়াকফ জমি বেচে দেওয়া হলো, এমন উদ্দেশ্য ভালো হলেও পথটা আইনসম্মত হতে হবে। মোতাওয়াল্লি প্রশাসকের কাছে আবেদন করলে প্রশাসক তদন্ত আর শুনানি করে শর্তসহ অনুমতি দিতে পারেন। সেই আদেশ ছাড়া বিক্রি হলে ক্রেতা, বিক্রেতা আর দলিল রেজিস্ট্রিকারী সবাই ঝুঁকিতে পড়েন।

আবার উল্টো ঘটনাও ঘটে। কারও ব্যক্তিগত জমিকে কেউ ওয়াকফ বলে দাবি করেন। তখন ৫০ ধারায় প্রশাসকের কাছে সিদ্ধান্ত চাওয়া যায়, আর সেই সিদ্ধান্তে আপত্তি থাকলে ৩ মাসের মধ্যে জেলা জজের কাছে আবেদন। নিজের দলিল, খতিয়ান আর খাজনার রসিদ গুছিয়ে রাখুন।

৫. অনুমতি ছাড়া কেনা হলে কী হয়, কেনার আগে কী দেখবেন

৫৬ ধারার তৃতীয় উপধারা অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া মোতাওয়াল্লির করা হস্তান্তর বাতিল ঘোষণা হবে, যদি প্রশাসক বিষয়টি জানার ৪ মাসের মধ্যে অথবা হস্তান্তরের তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে, যেটি পরে আসে, দেওয়ানি আদালতে আবেদন করেন। ৫৭ক ধারায় যে সাব-রেজিস্ট্রার জেনেশুনে এমন দলিল রেজিস্ট্রি করেন, তিনি অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গে সহায়তার দায়ে দায়ী।

মসজিদ বা মাদ্রাসার পাশের জমি কেনার আগে

ধরুন, কেউ বলছেন জমিটা তাঁর দাদার, তবে ঘরের পাশে পুরোনো একটা মসজিদ আর কবরস্থান আছে। এমন ক্ষেত্রে দামের চেয়ে কাগজটা আগে দেখুন। বিরোধ দেখা দিলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের রেকর্ড তুলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

ওয়াকফ সম্পত্তির মালিক কে?
উৎসর্গ করার পর সম্পত্তি ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে নিবেদিত। মোতাওয়াল্লি ব্যবস্থাপক, তদারকি করেন ওয়াকফ প্রশাসক। মোতাওয়াল্লি ব্যক্তিগত মালিকের মতো বেচতে পারেন না।
মোতাওয়াল্লি কি ওয়াকফের জমি ভাড়া দিতে পারেন?
৫ বছর পর্যন্ত মেয়াদে ইজারার জন্য ৫৬ ধারায় পূর্বানুমতির শর্ত নেই। ৫ বছরের বেশি মেয়াদে ইজারা দিতে প্রশাসকের পূর্বানুমতি লাগবে।
অনুমতি ছাড়া কেনা ওয়াকফ জমির দলিল কি বাতিল হতে পারে?
হ্যাঁ। প্রশাসক জানার ৪ মাস বা হস্তান্তরের ৩ বছরের মধ্যে, যেটি পরে, দেওয়ানি আদালতে আবেদন করলে হস্তান্তর বাতিল ঘোষণা হবে।
ওয়াকফ সম্পত্তি আইন কোনটি?
মূল আইন ওয়াকফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২ (The Waqfs Ordinance), যা পরে কয়েক দফা সংশোধিত হয়েছে। ৫৭ক ধারা যোগ হয় ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০১৩ দিয়ে।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন