ভূমি ও নামজারি

নাবালকের জমি বিক্রি: বাবা বা মা কি বেচতে পারবেন, আদালতের অনুমতি কখন লাগে, বাতিলের মামলা ৩ বছরে

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
নাবালকের জমি বিক্রি: বাবা বা মা কি বেচতে পারবেন, আদালতের অনুমতি কখন লাগে, বাতিলের মামলা ৩ বছরে

সংক্ষেপে

নাবালকের জমি বিক্রির মূল আইন অভিভাবকত্ব ও ওয়ার্ডস আইন, ১৮৯০ (The Guardians and Wards Act)। এর ২৯ ধারা বলছে, আদালত যাঁকে নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্ত বা ঘোষণা করেছে, তিনি আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, দান, বিনিময় বা বন্ধক দিতে পারেন না। অনুমতি মেলে শুধু প্রয়োজন বা নাবালকের স্পষ্ট সুবিধা দেখাতে পারলে।

অনুমতি ছাড়া এমন বিক্রি ৩০ ধারায় বাতিলযোগ্য। তামাদি আইনের প্রথম তফসিলের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাবালক সাবালক হওয়ার পর ৩ বছরের মধ্যে অভিভাবকের করা হস্তান্তর বাতিলের মামলা করতে পারেন। বাবা বা মা আদালত-নিযুক্ত অভিভাবক না হলে তাঁদের ক্ষমতা ব্যক্তিগত আইনে ঠিক হয়, তাই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ জরুরি।

জমির খতিয়ানে মালিক কে, আগে দেখুন

নাবালকের নামে রেকর্ড আছে কি না, খতিয়ান খুঁজে মিলিয়ে নিন।

খতিয়ান দেখুন
এই লেখায়
  1. নাবালক কে: ১৮ নাকি ২১ বছর
  2. নাবালকের জমি বাবা বা মা কি বেচতে পারবেন: আইন কী বলে
  3. নাবালকের সম্পত্তি বিক্রির নিয়ম: আদালতের অনুমতি নেবেন যেভাবে
  4. অনুমতি ছাড়া বিক্রি হলে: বাতিলযোগ্য দলিল আর মামলার সময়
  5. নাবালকের অংশ আছে এমন জমি কেনার আগে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. নাবালক কে: ১৮ নাকি ২১ বছর

সাবালকত্ব আইন, ১৮৭৫ (The Majority Act)-এর ৩ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশে বসবাসকারী একজন মানুষ ১৮ বছর পূর্ণ হলে সাবালক হন। তবে ১৮ বছরের আগে আদালত যদি তাঁর শরীর বা সম্পত্তির জন্য অভিভাবক নিযুক্ত বা ঘোষণা করে থাকে, অথবা কোর্ট অব ওয়ার্ডস তাঁর সম্পত্তির তত্ত্বাবধান নিয়ে থাকে, তাহলে তিনি সাবালক গণ্য হবেন ২১ বছর পূর্ণ হলে।

এই পার্থক্যটা জমির ক্ষেত্রে বড়। ধরুন, বাবা মারা যাওয়ার পর মা আদালত থেকে ১০ বছরের ছেলের সম্পত্তির অভিভাবক হিসেবে ঘোষিত হলেন। ছেলে তখন ১৮ নয়, ২১ বছর পূর্ণ হলে নিজে জমি বেচতে বা কিনতে পারবে। তার আগে তার নামের জমিতে যা হবে, তা অভিভাবকের মাধ্যমে আর আইনের শর্ত মেনে।

২. নাবালকের জমি বাবা বা মা কি বেচতে পারবেন: আইন কী বলে

২৯ ধারার শর্তটা আদালত-নিযুক্ত বা ঘোষিত সম্পত্তির অভিভাবকের জন্য। কালেক্টর বা উইলের মাধ্যমে নিযুক্ত অভিভাবক এর বাইরে। এমন অভিভাবক আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া যা পারবেন না, তা নিচে দেওয়া হলো।

  • নাবালকের স্থাবর সম্পত্তির কোনো অংশ বিক্রি, দান, বিনিময় বা অন্যভাবে হস্তান্তর
  • সেই সম্পত্তি বন্ধক বা দায়বদ্ধ করা
  • ৫ বছরের বেশি মেয়াদে ইজারা দেওয়া
  • নাবালক সাবালক হওয়ার তারিখের পর এক বছরের বেশি গড়ায়, এমন মেয়াদে ইজারা দেওয়া
স্বাভাবিক অভিভাবক হলে হিসাব আলাদা

বাবা বা মা আদালত থেকে অভিভাবক নিযুক্ত না হলে তাঁরা সন্তানের জমিতে কী করতে পারেন, তা ঠিক হয় সংশ্লিষ্ট ধর্মের ব্যক্তিগত আইনে। এই প্রশ্নে সাধারণ উত্তর দেওয়া নিরাপদ নয়। জমি বেচার আগে একজন আইনজীবীর লিখিত মত নিন।

বাস্তবে অনেক পরিবার মনে করে, বাবা বেঁচে থাকলে তিনিই সব করতে পারেন। কিন্তু ক্রেতা যখন পরে জানতে পারেন যে বিক্রেতাদের একজন নাবালক ছিল, তখন সেই দলিল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সতর্ক ক্রেতারা তাই নাবালকের অংশ থাকলে আদালতের অনুমতির আদেশ দেখতে চান।

৩. নাবালকের সম্পত্তি বিক্রির নিয়ম: আদালতের অনুমতি নেবেন যেভাবে

৩১ ধারা অনুমতির শর্ত ঠিক করেছে। আদালত অনুমতি দেবে কেবল প্রয়োজন থাকলে, অথবা কাজটি নাবালকের জন্য স্পষ্টভাবে সুবিধাজনক হলে। যেমন নাবালকের চিকিৎসা বা পড়াশোনার খরচ, অথবা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা জমি বেচে নিরাপদ জায়গায় জমি কেনা। কোনটা প্রয়োজন, তা আদালত নিজের বিবেচনায় দেখবে।

  • ১
    আইনজীবীর সঙ্গে আবেদন তৈরিকোন জমি, কেন বেচতে চান, টাকা কী কাজে লাগবে, তা লিখে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে আবেদন করুন। কোন আদালতে যাবেন, আইনজীবী আপনার এলাকা ও মামলার ধরন দেখে ঠিক করবেন।
  • ২
    জমির কাগজ জমাদলিল, হালনাগাদ খতিয়ান, খাজনার দাখিলা আর নাবালকের জন্মনিবন্ধন সনদ সঙ্গে দিন, যাতে আদালত সম্পত্তির বিবরণ মেলাতে পারে।
  • ৩
    আত্মীয়দের নোটিশ ও শুনানিআদালত চাইলে নাবালকের আত্মীয় বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের নোটিশ দিতে পারে। কেউ আপত্তি জানালে তাঁর বক্তব্য শুনে লিখে রাখা হয়।
  • ৪
    শর্তসহ আদেশঅনুমতির আদেশে প্রয়োজন বা সুবিধার কারণ, সম্পত্তির বিবরণ আর শর্ত লেখা থাকে। বিচারক নিজে আদেশে তারিখ দিয়ে স্বাক্ষর করেন।
  • ৫
    শর্ত মেনে বিক্রিআদেশে যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই বিক্রি করুন। পরে আদালতে হিসাব দিতে হতে পারে, তাই টাকার লেনদেন ব্যাংকে রাখুন।

আদালত যেসব শর্ত দিতে পারে (৩১ ধারা)

৪. অনুমতি ছাড়া বিক্রি হলে: বাতিলযোগ্য দলিল আর মামলার সময়

৩০ ধারা অনুযায়ী ২৮ বা ২৯ ধারা ভেঙে অভিভাবক নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করলে তা ক্ষতিগ্রস্ত অন্য যেকোনো ব্যক্তির আবেদনে বাতিলযোগ্য। লক্ষ করুন, আইনে শব্দটা ‘বাতিলযোগ্য’, অর্থাৎ দলিল নিজে থেকে শূন্য হয়ে যায় না। কেউ মামলা করে বাতিল করাতে হয়।

প্রশ্নআইনে যা আছে
কে মামলা করতে পারেনক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, সবচেয়ে সাধারণভাবে সাবালক হওয়ার পর নাবালক নিজে
কত দিনের মধ্যেতামাদি আইন, ১৯০৮-এর প্রথম তফসিল, অনুচ্ছেদ ৪৪: সাবালক হওয়ার দিন থেকে ৩ বছর
কিসের বিরুদ্ধেঅভিভাবকের করা সম্পত্তি হস্তান্তর
সাবালক কবেসাধারণত ১৮ বছরে, আদালত-নিযুক্ত অভিভাবক থাকলে ২১ বছরে

ধরুন, একটি মেয়ের ১২ বছর বয়সে তার নামের জমি আদালতের অনুমতি ছাড়া বেচে দেওয়া হলো। সাধারণ ক্ষেত্রে সে ১৮ বছরে সাবালক হলে ২১ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত বাতিলের মামলা করার সময় পাবে। তারিখ হিসাবের খুঁটিনাটি আর নিজের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম খাটে, তা আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন। বিরোধ থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের রেকর্ডও তুলে রাখুন।

৫. নাবালকের অংশ আছে এমন জমি কেনার আগে

ক্রেতা হিসেবে যা মিলিয়ে নেবেন

সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো নাবালকের অংশ বাদ দিয়ে সাবালক শরিকদের অংশ কেনা, অথবা অনুমতির আদেশ হাতে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা। কম দামে পাওয়া যাচ্ছে বলে তাড়াহুড়া করলে ১০ বছর পরেও মামলার ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

৬. অনেকে যা জানতে চান

নাবালকের জমি বাবা বেচতে পারবে কি?
বাবা আদালত থেকে সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্ত বা ঘোষিত হলে আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া পারবেন না, এটি ২৯ ধারার শর্ত। আদালত-নিযুক্ত না হলে তাঁর ক্ষমতা ব্যক্তিগত আইনে ঠিক হয়, সে ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
নাবালকের জমি মা বেচতে পারবে কি?
একই নিয়ম। মা আদালত-নিযুক্ত অভিভাবক হলে বিক্রির আগে আদালতের অনুমতি লাগবে। অনুমতি মেলে কেবল প্রয়োজন বা সন্তানের স্পষ্ট সুবিধা দেখাতে পারলে।
নাবালকের সম্পত্তি কেউ বিক্রি করলে সে কত দিনের মধ্যে মামলা করতে পারবে?
তামাদি আইনের প্রথম তফসিলের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অভিভাবকের করা হস্তান্তর বাতিলের মামলা সাবালক হওয়ার দিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে করতে হয়।
নাবালকের নামে জমি কেনা যায় কি?
অভিভাবকত্ব আইনের ২৯ ধারার নিষেধ বিক্রি, দান, বিনিময় আর বন্ধক নিয়ে। নাবালকের নামে কেনার দলিল কীভাবে সম্পাদন হবে, তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আর দলিল লেখকের কাছে আগেই জেনে নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন