
সংক্ষেপে
জমি রেজিস্ট্রির দিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস মূল দলিল রেখে দেয় আর যিনি দলিল দাখিল করেছেন তাঁকে একটি রশিদ দেয়। দলিলের কপি বালাম বইয়ে তোলা শেষ হলে মূল দলিল উত্তোলন করা যায়। ফেরত পান রশিদধারী নিজে, অথবা রশিদে লিখে যাঁকে মনোনীত করা হয়েছে তিনি। এটা নিবন্ধন আইনের ৫২ ও ৬১ ধারার কথা।
মূল দলিল কতদিন পর পাওয়া যায়, তার কোনো নির্দিষ্ট দিন আইনে নেই। অফিসের কাজের চাপের ওপর নির্ভর করে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের পরিপত্র অনুযায়ী রশিদে মোবাইল নম্বর লেখা থাকলে দলিল তৈরি হলে SMS দিয়ে জানানোর কথা। দুই বছরের বেশি দলিল না তুললে আইন অনুযায়ী তা নষ্ট করে ফেলা যায়, তাই দেরি করবেন না।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তালিকা, রেজিস্ট্রেশন ফি আর পরিপত্র এখানে পাবেন।
এই লেখায়
১. রেজিস্ট্রির দিন মূল দলিল কেন রেখে দেওয়া হয়
সাব-রেজিস্ট্রার দলিলে সই করে রেজিস্ট্রি মঞ্জুর করেন। তারপর পুরো দলিলের কপি অফিসের বালাম বইয়ে তুলতে হয়। নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৫২(১)(গ) ধারা বলছে, রেজিস্ট্রির জন্য গৃহীত দলিল অযথা দেরি না করে বইয়ে কপি করতে হবে। এই কপিই পরে নকল বা সার্টিফাইড কপির উৎস।
কপি তোলা আর সনদ লেখা শেষ হলে ৬১ ধারা অনুযায়ী রেজিস্ট্রি সম্পূর্ণ হয় এবং মূল দলিল ফেরত দেওয়া হয়। তাই রেজিস্ট্রির দিন হাতে দলিল না পাওয়াটা স্বাভাবিক। সেদিন আপনার হাতে থাকবে শুধু একটি রশিদ।
৫২(১)(খ) ধারা অনুযায়ী দলিল দাখিলের সময় রেজিস্ট্রারিং অফিসার দাখিলকারীকে একটি রশিদ দেন। মূল দলিল উত্তোলনের দিন এই রশিদ দেখাতে হয়। ফটোকপি করে আলাদা জায়গায় রেখে দিন।
২. রশিদে কার নাম থাকবে, কে দলিল তুলতে পারবেন
অনেক সময় দলিল দাখিল করেন দলিল লেখক বা বিক্রেতা পক্ষের কেউ। তখন রশিদও যায় তাঁর হাতে। ক্রেতা হিসেবে এটা খেয়াল না করলে পরে দলিল তুলতে গিয়ে ঝামেলা হয়।
৬১(২) ধারা অনুযায়ী মূল দলিল ফেরত পাবেন যিনি দাখিল করেছেন তিনি, অথবা রশিদে লিখিতভাবে যাঁকে মনোনীত করা হয়েছে তিনি। তাই রেজিস্ট্রির দিনই রশিদে আপনার, মানে ক্রেতার, নাম প্রতিনিধি হিসেবে লিখিয়ে নিন। দাখিলকারী সেখানে সই করবেন।
রেজিস্ট্রির দিনই রশিদে মিলিয়ে নিন
৩. মূল দলিল কতদিন পর পাওয়া যায়, খবর পাবেন কীভাবে
জমি রেজিস্ট্রির কতদিন পর দলিল পাওয়া যায়, এর বাঁধা উত্তর নেই। আইনে শুধু অযথা দেরি না করার কথা আছে, দিনের সংখ্যা নেই। যে অফিসে রেজিস্ট্রি বেশি হয়, সেখানে বালাম তোলায় বেশি সময় লাগে।
নিবন্ধন অধিদপ্তর ৯ মে ২০২৪ তারিখের পরিপত্রে সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে নির্দেশ দিয়েছে, রশিদ দেওয়ার সময় মূল দলিল গ্রহণকারী বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধির নামের সঙ্গে মোবাইল নম্বর লিখে রাখতে হবে। নিবন্ধনের কাজ শেষ হলে দলিল ফেরত নেওয়ার জন্য সেই নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠাতে হবে।
- ১রশিদে নম্বর আছে কি না দেখুনরেজিস্ট্রির দিনই নিশ্চিত হন রশিদে আপনার সচল মোবাইল নম্বর লেখা হয়েছে। নম্বর ভুল হলে SMS আসবে না।
- ২SMS-এর অপেক্ষা করুনদলিল তৈরি হলে অফিস থেকে বার্তা আসার কথা। অনেক দিন হয়ে গেলে রশিদ নিয়ে নিজে অফিসে গিয়ে খোঁজ নিন।
- ৩রশিদ আর পরিচয়পত্র নিয়ে যানমূল রশিদ আর আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে নিন। প্রতিনিধি হয়ে গেলে রশিদে তাঁর নাম লেখা থাকা দরকার।
- ৪দলিল হাতে নিয়ে মিলিয়ে দেখুনপেছনের পাতায় রেজিস্ট্রেশন সনদ, বই নম্বর, খণ্ড আর পৃষ্ঠা নম্বর আছে কি না দেখুন। এসব নম্বরই পরে নকল তুলতে লাগে।
একটা উদাহরণ ধরুন। রহিম সাহেব জমি কিনলেন, দলিল দাখিল করলেন দলিল লেখক। রশিদও রইল লেখকের কাছে, সেখানে রহিম সাহেবের নাম বা নম্বর নেই। মাস তিনেক পর লেখককে আর ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় দলিল তুলতে অফিসে বাড়তি দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। রেজিস্ট্রির দিন পাঁচ মিনিট সময় দিয়ে রশিদে নিজের নাম আর নম্বর লিখিয়ে নিলে এই ঝামেলা হয় না।
৪. মূল দলিল উত্তোলন করতে কত টাকা লাগে
রেজিস্ট্রির খরচ, মানে স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি আর অন্য কর, রেজিস্ট্রির আগেই দিতে হয়। নিবন্ধন অধিদপ্তরের ফির তালিকায় মূল দলিল ফেরত নেওয়ার জন্য আলাদা কোনো ঘর আমরা পাইনি। কেউ এই কাজে টাকা চাইলে কোন খাতের টাকা আর সরকারি রসিদ দেওয়া হবে কি না, জিজ্ঞেস করুন।
| কাজ | কখন টাকা লাগে |
|---|---|
| দলিল রেজিস্ট্রি | রেজিস্ট্রির আগে স্ট্যাম্প, রেজিস্ট্রেশন ফি ও কর |
| মূল দলিল ফেরত নেওয়া | সরকারি ফির তালিকায় আলাদা ঘর পাওয়া যায়নি |
| দলিলের নকল বা সার্টিফাইড কপি | নকলের নির্ধারিত সরকারি ফি দিতে হয় |
মূল দলিল হাতে আসার আগেই নামজারির আবেদন করতে চাইলে নকল তুলে নিতে পারেন। নিবন্ধন আইনের ৫৭ ধারায় বইয়ের কপির নকল দেওয়ার বিধান আছে। নকলের ফি আর আবেদনের ধাপ আমাদের দলিল তল্লাশি ও নকলের লেখায় দেওয়া আছে।
৫. রশিদ হারালে বা দুই বছর পেরিয়ে গেলে
দলিলের রশিদ হারিয়ে গেলে কী করতে হবে, নিবন্ধন আইনে আলাদা করে বলা নেই। তাই যে অফিসে রেজিস্ট্রি হয়েছে, সেখানকার সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত আবেদন করুন। দলিল নম্বর, রেজিস্ট্রির তারিখ, দাতা ও গ্রহীতার নাম লিখুন। তিনি কোন প্রমাণ চান, সেটা জেনে নিন। রশিদ হারানোর কথা জানিয়ে থানায় জিডি করে রাখলে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।
নিবন্ধন আইনের ৮৫ ধারা বলছে, উইল ছাড়া অন্য দলিল দুই বছরের বেশি সময় অফিসে দাবিহীন পড়ে থাকলে তা নষ্ট করা যেতে পারে। তখন হাতে থাকবে শুধু বালাম বইয়ের নকল।
মূল দলিল হাতে পেলে পরের কাজ নামজারি। নামজারি ছাড়া খতিয়ানে আপনার নাম ওঠে না, খাজনাও আপনার নামে দেওয়া যায় না। দলিল নিয়ে কোনো বিরোধ বা জটিলতা থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার, এসি (ল্যান্ড) অফিস অথবা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
মূল দলিল কতদিন পর পাওয়া যায়?
মূল দলিল উত্তোলন করতে কত টাকা লাগে?
অন্য কেউ কি আমার হয়ে মূল দলিল তুলতে পারবেন?
দলিলের রশিদ হারিয়ে গেলে করণীয় কী?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।