ভূমি ও নামজারি

জমি দখল হলে করণীয়: ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এ কোন পথ

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
জমি দখল হলে করণীয়: ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এ কোন পথ

সংক্ষেপে

জোর করে কেউ আপনার জমি দখল করলে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৭ ধারায় সেটি অপরাধ, শাস্তি অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। এই আইনের অপরাধ আমলযোগ্য, তাই থানায় মামলা করা যায়। বিচার করেন প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, আর মামলা পাওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা।

আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া দখলচ্যুত হলে আইনের ৮ ধারায় দখল পুনরুদ্ধারের জন্য এখতিয়ারসম্পন্ন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদনের বিধান আছে। মালিকানা নিয়েই বিরোধ থাকলে পথ দেওয়ানি আদালত। যেকোনো পথে নামার আগে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আইনটির পূর্ণ পাঠ পড়ুন

আইন ও বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ২৭টি ধারা আছে।

আইনটি খুলুন
এই লেখায়
  1. আইনে কে বৈধ দখলদার
  2. কোন কাজ কোন ধারায় অপরাধ
  3. দখল ঠেকাতে বা ফেরত পেতে ধাপ
  4. মালিকানা নিয়েই বিরোধ থাকলে
  5. যে দুর্বলতায় মামলা হেরে যায়
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. আইনে কে বৈধ দখলদার

৭ ধারার (১) উপধারা অনুযায়ী জমি নিজের দখলে রাখতে পারেন কেবল এমন ব্যক্তি, যাঁর ক্ষেত্রে নিচের কোনো একটি খাটে:

  • স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্টের ১৪৩ বা ১৪৪ ধারায় হালনাগাদ করা বলবৎ সর্বশেষ খতিয়ানের মালিক।
  • ওই মালিকের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পাওয়া ব্যক্তি।
  • হস্তান্তর বা দখলের জন্য আইনানুগভাবে সম্পাদিত দলিলের মাধ্যমে অধিকার পাওয়া ব্যক্তি।
  • আদালতের আদেশে মালিকানা বা দখলের অধিকার পাওয়া ব্যক্তি।

(২) উপধারা বলছে, আইনানুগভাবে দখলের অধিকারী কাউকে উপযুক্ত আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত করা যাবে না, তাঁকে জমিতে ঢুকতে বাধাও দেওয়া যাবে না। এর যেকোনোটি লঙ্ঘন করলে অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

সব বিরোধ এই ধারায় অপরাধ নয়

উত্তরাধিকার বা হস্তান্তরসূত্রে মালিক হয়ে যিনি জমি দখলে রেখেছেন, তিনি যদি রেকর্ড সংশোধন বা স্বত্ব ঘোষণার মামলা করে থাকেন, তাহলে তাঁর দখল ৭ ধারায় অপরাধ ধরা হবে না। ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ নিয়ে বিরোধে এই শর্তটি প্রায়ই সামনে আসে।

২. কোন কাজ কোন ধারায় অপরাধ

ধারাকাজশাস্তি বা প্রকৃতি
৪ভূমি প্রতারণা সংক্রান্ত অপরাধঅ-জামিনযোগ্য
৫মিথ্যা দলিল তৈরি, সম্পাদিত দলিলে কাটাছেঁড়া বা পরিবর্তন, জোর করে দলিলে সই করানোঅনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড, অ-জামিনযোগ্য
৭বৈধ অধিকার ছাড়া জমি দখলে রাখা, আদেশ ছাড়া উচ্ছেদ বা ঢুকতে বাধাঅনধিক ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড
৯বিক্রির পর ক্রেতাকে জমির দখল হস্তান্তর না করাদণ্ডনীয় অপরাধ
১০অন্যের বৈধ দখলের জমির সীমানা বা সীমানা চিহ্ন নষ্ট করা, জমি, স্থাপনা, গাছ বা ফসলের ক্ষতিঅনধিক ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড
১১ ও ১২সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহারের জমি দখল, ভরাট বা শ্রেণি পরিবর্তনদণ্ডনীয় অপরাধ, জেলা প্রশাসক উচ্ছেদের আদেশ দিতে পারেন

১৯ ধারা অনুযায়ী এই আইনের সব অপরাধ আমলযোগ্য। ৪ ও ৫ ধারার অপরাধ অ-জামিনযোগ্য, বাকিগুলো জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য। ১৬ ধারায় অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনাও দণ্ডনীয়, আর ১৭ ধারায় একই অপরাধ আবার করলে আলাদা দণ্ডের বিধান আছে।

৩. দখল ঠেকাতে বা ফেরত পেতে ধাপ

  • ১
    মালিকানা আর দখলের কাগজ গুছিয়ে নিনসর্বশেষ জরিপের খতিয়ান, নামজারি খতিয়ান, দলিল বা ওয়ারিশ সনদ, হালনাগাদ খাজনার দাখিলা আর মৌজা ম্যাপের কপি এক ফাইলে রাখুন। ৭ ধারা হালনাগাদ খতিয়ানের ওপর জোর দেয়, তাই নামজারি বাকি থাকলে আগে সেটি করুন।
  • ২
    ঘটনার প্রমাণ রাখুনদখলের চেষ্টা, ঘর তোলা, বেড়া বা সীমানা খুঁটি সরানোর ছবি ও ভিডিও তারিখসহ রাখুন। কারা ছিলেন, কারা দেখেছেন, সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা লিখে রাখুন।
  • ৩
    থানায় মামলা করুনঅপরাধ আমলযোগ্য হওয়ায় জমি যে থানার এলাকায়, সেখানে লিখিত অভিযোগ দিয়ে মামলা করা যায়। কোন ধারায় কী ঘটেছে, অভিযোগে স্পষ্ট লিখুন এবং কাগজের কপি দিন।
  • ৪
    দখল পুনরুদ্ধারের আবেদনআদেশ ছাড়াই দখলচ্যুত হলে ৮ ধারায় এখতিয়ারসম্পন্ন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন করা যায়। আবেদনের সময়সীমা ও পদ্ধতি আইনজীবী বা উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে জেনে নিন।
  • ৫
    ক্ষতিপূরণ চান২০ ধারায় বিচারকারী আদালত দখল অর্পণের জন্য বিষয়টি এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে পারেন, আর আর্থিক ক্ষতি হলে অপরাধীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে আপনাকে দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। মামলায় ক্ষতির হিসাব আর প্রমাণ দিন।

২২ ধারা অনুযায়ী ৪, ৫, ১৫ ও ১৭ ধারা ছাড়া বাকি অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যায়। চলমান দখলের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত জানানো তাই কাজে লাগতে পারে।

৪. মালিকানা নিয়েই বিরোধ থাকলে

ভূমি অপরাধ আইন অন্য আইনের বিধানের অতিরিক্ত, বিকল্প নয় (৩ ধারা)। তাই দেওয়ানি পথও খোলা থাকে:

  • দখলচ্যুত হলে নির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৯ ধারায় দখল ফেরতের মামলা করা যায়। এখানে মালিকানার প্রশ্ন না তুলেই শুধু আগের দখল প্রমাণ করে জমি ফেরত চাওয়া যায়। তবে সরকারের বিরুদ্ধে এই মামলা চলে না, আর এই মামলার রায়ে আপিল বা রিভিউয়ের সুযোগ নেই। এ মামলার তামাদির সময় কম, তাই দেরি করবেন না।
  • মালিকানা বা স্বত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে স্বত্ব ঘোষণা ও দখলের মামলা করতে হয়।
  • খতিয়ানে ভুল নাম বা ভুল অংশ লেখা থাকলে আগে রেকর্ড সংশোধনের পথে যান।
নিজে পাল্টা দখল নেবেন না

৭ ধারায় আদেশ ছাড়া কাউকে উচ্ছেদ করা বা ঢুকতে বাধা দেওয়াও অপরাধ। প্রতিপক্ষ মামলা করে থাকলে লোক জোগাড় করে পাল্টা দখল নিতে গেলে উল্টো আপনিই আসামি হতে পারেন। আইনের পথে থাকুন, আর বিরোধে উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৫. যে দুর্বলতায় মামলা হেরে যায়

এখনই মিলিয়ে নিন

সরকারি খাস জমি বা রাস্তা, খাল, মাঠের মতো জনসাধারণের জমি দখল হলে তা ১১ ও ১২ ধারার বিষয়। সেখানে ১৪ ধারায় জেলা প্রশাসক অবৈধ দখল ও স্থাপনা সরানোর আদেশ দিতে পারেন। এমন ঘটনা উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জানান।

৬. অনেকে যা জানতে চান

ভাই বা চাচা ওয়ারিশ হয়ে আমার ভাগের জমি দখলে রেখেছেন। এটা কি ৭ ধারার অপরাধ?
নির্ভর করে তিনি কীভাবে দখলে আছেন তার ওপর। উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হয়ে দখলে থাকা ব্যক্তি রেকর্ড সংশোধন বা স্বত্ব ঘোষণার মামলা করে থাকলে ৭ ধারায় তা অপরাধ নয়। ওয়ারিশদের ভাগাভাগি সাধারণত বণ্টননামা দলিল বা বাটোয়ারা মামলায় মেটে। আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
পুরো টাকা নিয়েও বিক্রেতা জমির দখল দিচ্ছেন না। কী করব?
আইনের ৯ ধারায় ক্রেতাকে বিক্রিত জমির দখল হস্তান্তর না করা দণ্ডনীয় অপরাধ। রেজিস্ট্রি দলিল, টাকা দেওয়ার প্রমাণ আর নামজারির কাগজ নিয়ে থানায় মামলা করতে পারেন, পাশাপাশি দেওয়ানি প্রতিকারের জন্য আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
এই আইনে মামলার বিচার কত দিনে শেষ হওয়ার কথা?
১৯ ধারা অনুযায়ী মামলা পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। বিচার করেন প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।
সরকারি খাস জমি দখল হতে দেখলে কোথায় জানাব?
সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহারের জমি দখল ১১ ও ১২ ধারার অপরাধ, আর ১৪ ধারায় জেলা প্রশাসক উচ্ছেদ ও আগের অবস্থায় ফেরানোর আদেশ দিতে পারেন। উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিতভাবে জানান।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন