ভূমি ও নামজারি

দলিল বাতিলের মামলা: কে করতে পারেন, ৩ বছরের তামাদি আর রায়ের পর যা হয়

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
দলিল বাতিলের মামলা: কে করতে পারেন, ৩ বছরের তামাদি আর রায়ের পর যা হয়

সংক্ষেপে

রেজিস্ট্রি হওয়া দলিল বাতিল করার ক্ষমতা আইনে দেওয়া আছে আদালতকে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী যাঁর বিরুদ্ধে কোনো দলিল বাতিল বা বাতিলযোগ্য, আর দলিলটি টিকে থাকলে যাঁর গুরুতর ক্ষতির যুক্তিসংগত আশঙ্কা আছে, তিনিই দলিল বাতিলের মামলা করতে পারেন। আদালত রায় দিলে তার কপি যায় সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে, তিনি বইয়ে বাতিলের কথা লিখে রাখেন।

সময়টাই সবচেয়ে বড় বিষয়। তামাদি আইনের তফসিল অনুযায়ী দলিল বাতিলের মামলার সময়সীমা ৩ বছর, গোনা শুরু হয় যেদিন বাতিলের কারণগুলো আপনি জানতে পারেন। জাল দলিল ঘোষণার মামলাতেও সময় ৩ বছর। তাই সন্দেহ হলেই দলিলের নকল তুলে আইনজীবীর সঙ্গে বসুন।

দলিলের নকল তুলুন

মামলার আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বিরোধের দলিলের সার্টিফাইড কপি লাগবে, নিবন্ধন অধিদপ্তরে অফিসের তথ্য পাবেন।

নিবন্ধন অধিদপ্তর
এই লেখায়
  1. দলিল বাতিল করার নিয়ম: পথটা আদালত
  2. দলিল বাতিলের মামলা কে করতে পারে
  3. দলিল বাতিলের মামলা তামাদি: ৩ বছর কবে থেকে গোনা হয়
  4. মামলার আগে যে কাগজ গুছিয়ে নেবেন
  5. সাফ কবলা বা দানপত্র দলিল কি বাতিল করা যায়
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. দলিল বাতিল করার নিয়ম: পথটা আদালত

অনেকে ভাবেন, যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল হয়েছে, সেখানে আবেদন করলেই দলিল বাতিল হবে। আইনের কাঠামো তা বলে না। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় দলিল বাতিল বা বাতিলযোগ্য ঘোষণা করে ফেরত দেওয়ার ও বাতিলের আদেশ দেন আদালত। দলিলটি নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর অধীনে রেজিস্ট্রি করা হলে আদালত রায়ের কপি সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠান, আর সেখানকার কর্মকর্তা বইয়ে রাখা দলিলের কপিতে বাতিলের কথা লিখে দেন।

এর মানে, বাতিলের সিদ্ধান্ত হয় দেওয়ানি মামলায়, প্রমাণ আর শুনানির পর। রেজিস্ট্রি অফিসের কাজ শুধু আদালতের রায় রেকর্ডে তোলা।

পুরো দলিল না, অংশও বাতিল হতে পারে

একই দলিলে আলাদা আলাদা অধিকার বা দায় থাকলে আদালত উপযুক্ত ক্ষেত্রে দলিলের একটি অংশ বাতিল করে বাকিটা বহাল রাখতে পারেন। এটা একই আইনের ৪০ ধারার কথা।

২. দলিল বাতিলের মামলা কে করতে পারে

৩৯ ধারায় দুটি শর্ত আছে। প্রথমত, দলিলটি মামলাকারীর বিরুদ্ধে বাতিল (void) বা বাতিলযোগ্য (voidable) হতে হবে। দ্বিতীয়ত, দলিলটি এভাবে থেকে গেলে তাঁর গুরুতর ক্ষতি হতে পারে, এমন যুক্তিসংগত আশঙ্কা থাকতে হবে। দূরের কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশী শুধু আপত্তি আছে বলে মামলা করতে পারেন না।

আইনের উদাহরণগুলো থেকে কোন ধরনের দলিল এর আওতায় পড়ে, তা বোঝা যায়:

  • জাল দলিল: কেউ জমি দখল করে এমন জাল দলিল দেখাল যাতে লেখা আগের হস্তান্তরটি তার জন্য ট্রাস্টে হয়েছিল। প্রকৃত মালিক সেই জাল দলিল বাতিল করাতে পারেন।
  • প্রতারণা করে করানো দলিল: মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাউকে দিয়ে দলিল করানো হলে প্রতারিত ব্যক্তি বাতিল চাইতে পারেন।
  • বিক্রির পর পেছনের তারিখ দিয়ে করা দলিল: জমি বিক্রির পর বিক্রেতা আগের তারিখ বসিয়ে অন্য কাউকে লিজ দিয়ে রেজিস্ট্রি করালে ক্রেতা সেটি বাতিল করাতে পারেন।

উত্তরাধিকারের জমিতে কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে বা তাঁর অংশ জাল সইয়ে বিক্রি হলে ক্ষতিগ্রস্ত ওয়ারিশ এই পথ নিয়ে ভাবতে পারেন। আপনার ঘটনা কোন শ্রেণিতে পড়ে, তা ঠিক করবেন আইনজীবী।

৩. দলিল বাতিলের মামলা তামাদি: ৩ বছর কবে থেকে গোনা হয়

তামাদি আইন, ১৯০৮-এর তফসিলে দলিলসংক্রান্ত কয়েকটি মামলার সময় আলাদা করে বলা আছে। প্রতিটির মেয়াদ ৩ বছর, তবে গোনা শুরুর দিন আলাদা।

মামলার ধরনসময়গোনা শুরু
দলিল বাতিল বা রদ করা (অনুচ্ছেদ ৯১)৩ বছরযেদিন বাতিলের কারণগুলো মামলাকারী জানতে পারেন
জারি বা রেজিস্ট্রি হওয়া দলিল জাল ঘোষণা (অনুচ্ছেদ ৯২)৩ বছরযেদিন দলিলটি জারি বা রেজিস্ট্রির কথা জানতে পারেন
আপনার বিরুদ্ধে কার্যকর করার চেষ্টা হওয়া দলিল জাল ঘোষণা (অনুচ্ছেদ ৯৩)৩ বছরযেদিন কার্যকর করার চেষ্টা হয়
প্রতারণার ভিত্তিতে প্রতিকার (অনুচ্ছেদ ৯৫)৩ বছরযেদিন প্রতারণার কথা জানতে পারেন

একটা উদাহরণ ধরুন। রহিম সাহেব বিদেশে ছিলেন। ২০২৬ সালের মার্চে দেশে ফিরে নকল তুলে দেখলেন, ২০১৯ সালে তাঁর জমি জাল সইয়ে বিক্রি হয়েছে। এখানে সময় গোনা শুরু হতে পারে তিনি যেদিন জানলেন সেদিন থেকে, ২০১৯ থেকে নয়। কিন্তু কবে জেনেছেন, তা আদালতে প্রমাণ করতে হবে। তাই জানার দিনের কাগজ, যেমন নকলের আবেদনের রসিদ, রেখে দিন।

শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা করবেন না

তামাদি পার হলে ভালো দাবিও আদালতে টেকে না। কোন অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য, তা ঘটনার ওপর নির্ভর করে। সন্দেহ জাগার দিন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করুন।

৪. মামলার আগে যে কাগজ গুছিয়ে নেবেন

যা হাতে রাখবেন

  • ১
    দলিলের নকল তুলুনদলিল নম্বর, সাল আর অফিস জেনে তল্লাশি করে সার্টিফাইড কপি নিন। নম্বর না জানলে মৌজা আর দাগ ধরে তল্লাশি করা যায়।
  • ২
    খতিয়ানে কী উঠেছে দেখুনবিরোধের দলিলের ভিত্তিতে নামজারি হয়ে গেছে কি না অনলাইনে খতিয়ান খুঁজে দেখুন। হয়ে থাকলে সেটাও আইনজীবীকে জানান।
  • ৩
    আইনজীবীর সঙ্গে বসুনকোন অনুচ্ছেদে তামাদি গোনা হবে, শুধু বাতিল চাইবেন না সঙ্গে অন্য প্রতিকারও, কোন আদালতে মামলা যাবে আর কোর্ট ফি কত, এগুলো দাবির ধরন ও জমির মূল্যের ওপর নির্ভর করে।
  • ৪
    রায়ের পর রেকর্ড ঠিক করুনবাতিলের রায় হলে আদালত কপি রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠান। খতিয়ান বা নামজারি সংশোধনের জন্য রায়ের সার্টিফাইড কপি নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে খোঁজ নিন।

৫. সাফ কবলা বা দানপত্র দলিল কি বাতিল করা যায়

যায়, তবে মন বদলেছে বলে নয়। বিক্রেতা পরে বেশি দাম চেয়ে বা দাতা সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় দলিল বাতিল চাইলে ৩৯ ধারার শর্ত মেলে না। দলিলটি জাল, প্রতারণা করে করানো, বা অন্য কোনো কারণে মামলাকারীর বিরুদ্ধে বাতিল বা বাতিলযোগ্য হতে হবে।

হেবা বা দানের দলিলের ক্ষেত্রে আলাদা কিছু নিয়ম আছে, দাতা কখন দান ফেরাতে পারেন আর কখন পারেন না। সে বিষয়ে আমাদের হেবা দলিলের লেখাটি পড়ে নিন। জমি নিয়ে বিরোধ জটিল হলে উপজেলা ভূমি অফিস বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।

৬. অনেকে যা জানতে চান

দলিল বাতিলের মামলা কে করতে পারে?
যাঁর বিরুদ্ধে দলিলটি বাতিল বা বাতিলযোগ্য এবং দলিলটি থেকে গেলে যাঁর গুরুতর ক্ষতির যুক্তিসংগত আশঙ্কা আছে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় এই দুই শর্ত দেওয়া আছে।
দলিল বাতিলের মামলার তামাদি কত দিন?
তামাদি আইনের তফসিলের অনুচ্ছেদ ৯১ অনুযায়ী ৩ বছর, গোনা শুরু হয় বাতিলের কারণগুলো জানার দিন থেকে। জাল ঘোষণার মামলাতেও সময় ৩ বছর, তবে শুরুর দিন আলাদা।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করে কি দলিল বাতিল করা যায়?
আইনে বাতিলের আদেশ দেন আদালত। রায়ের কপি পেলে রেজিস্ট্রি অফিস বইয়ে বাতিলের কথা লিখে রাখে।
দলিল বাতিলের মামলার কোর্ট ফি কত?
এটি দাবির ধরন আর জমির মূল্যের ওপর নির্ভর করে, তাই একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বলা যায় না। আইনজীবী আরজি তৈরির সময় হিসাব করে দেন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন