
সংক্ষেপে
জমির দলিল হারিয়ে গেলে মালিকানা হারায় না, কারণ রেজিস্ট্রির সময় দলিলের পুরো লেখা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বইতে তোলা থাকে। প্রথমে থানায় বা অনলাইনে জিডি করুন, তারপর যে অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছিল সেখান থেকে সার্টিফাইড কপি বা নকল তুলুন।
সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী মূল কাগজ হারিয়ে গেলে তার বদলে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রমাণ দেওয়া যায়, আর সরকারি রেকর্ডের সার্টিফাইড কপি দিয়েই দলিলের লেখা প্রমাণ করা যায়। সঙ্গে খতিয়ান, নামজারির কাগজ আর খাজনার রশিদ থাকলে মালিকানা দেখাতে সমস্যা হয় না।
দলিল হারানোর জিডি পুলিশের অনলাইন জিডি সেবা থেকেও করা যায়।
এই লেখায়
১. জমির দলিল হারিয়ে গেলে কি মালিকানা চলে যায়
না। দলিল রেজিস্ট্রি হলে তার হুবহু লেখা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেজিস্ট্রি বইতে নকল করে রাখা হয়, আর নাম ও মৌজা ধরে সূচি তৈরি হয়। আপনার ঘরের কাগজটি সেই রেকর্ডের একটি কপি মাত্র। ঘরের কাগজ পুড়ে গেলে, পানিতে নষ্ট হলে বা চুরি হলে অফিসের রেকর্ড থেকে আবার আইনসম্মত কপি পাওয়া যায়।
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬৫(গ) ধারা বলছে, মূল কাগজ নষ্ট বা হারিয়ে গেলে তার বদলে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রমাণ (secondary evidence) দেওয়া যায়। ৭৪ ধারায় বেসরকারি দলিলের সরকারি রেকর্ডও সরকারি দলিল হিসেবে গণ্য, আর ৭৭ ধারায় এমন রেকর্ডের সার্টিফাইড কপি দিয়ে দলিলের লেখা প্রমাণ করা যায়। তাই হারানো দলিলের জায়গা নেয় সার্টিফাইড কপি।
একটি উদাহরণ দেখা যাক। রহিম সাহেবের বাবা ১৯৯৮ সালে জমি কিনেছিলেন, বন্যায় ঘরের আলমারিসহ দলিল নষ্ট হয়েছে। নামজারির পুরোনো কাগজে দলিল নম্বর আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম লেখা ছিল। সেই তথ্য দিয়ে তিনি জিডি করেন, তারপর একই অফিসে নকলের দরখাস্ত দিয়ে সার্টিফাইড কপি তোলেন। জমির মালিকানায় কোনো পরিবর্তন হয়নি, শুধু কাগজটা নতুন করে হাতে এসেছে।
২. জমির দলিল হারিয়ে গেলে করণীয়: ৪ ধাপ
- ১জিডি করুননিকটস্থ থানায় অথবা পুলিশের অনলাইন জিডি সেবায় দলিল হারানোর জিডি করুন। দলিলের নম্বর, সাল, কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস আর দাতা-গ্রহীতার নাম যতটা জানেন লিখুন। জিডির কপি রেখে দিন, পরে অনেক জায়গায় চাইবে।
- ২দলিলের তথ্য খুঁজে বের করুনপুরোনো ফটোকপি, নামজারির কাগজ, খাজনার রশিদ বা খতিয়ানে দলিলের নম্বর ও সাল লেখা থাকে। মূল দলিল তোলার রশিদ থাকলে সেখানেও নম্বর পাবেন।
- ৩সার্টিফাইড কপির দরখাস্ত দিনযে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেখানে নকলের দরখাস্ত (৩৭ নং ফরম) দিন। নম্বর জানা না থাকলে আগে তল্লাশের দরখাস্ত দিয়ে নম্বর বের করতে হবে।
- ৪অন্য প্রমাণ গুছিয়ে রাখুননকল হাতে পেলে খতিয়ান, নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর, খাজনার রশিদ আর জিডির কপির সঙ্গে একটি ফাইলে রাখুন। মূল দলিলের কাজ এখন এগুলো মিলে করবে।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের তালিকায় সাধারণ নকলে প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা ফি আর ৩৬ টাকা নকলনবিশের পারিশ্রমিক, সঙ্গে ২০ টাকার কোর্ট ফি আর ১০০ বা ২০০ টাকার স্ট্যাম্প লাগে। তল্লাশ লাগলে তার ফি আলাদা। প্রতিটি টাকার রসিদ নিন।
৩. দলিল নম্বর জানা না থাকলে কিভাবে পাওয়া যাবে
অনেকের হাতে দলিলের ফটোকপিও থাকে না, শুধু জানেন বাবা কোন সালে জমি কিনেছিলেন। এ ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশের দরখাস্ত দিতে হয়। কত সাল খুঁজতে হবে, তার ওপর ফি আর সময় নির্ভর করে, তাই সালের সীমা যত ছোট করতে পারবেন, খরচ তত কমবে।
তল্লাশের আগে যা জেনে নিন
খতিয়ানে নামজারির সূত্র হিসেবে অনেক সময় দলিল নম্বর লেখা থাকে। তাই আগে অনলাইনে নিজের নামজারি খতিয়ানটি দেখে নিন। খুব পুরোনো দলিলের বই জেলা রেজিস্ট্রারের রেকর্ড রুমে থাকতে পারে, কোথায় আবেদন করবেন তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জেনে নিন।
নামজারি করা থাকলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টালে নামজারি খতিয়ান খুঁজে দেখুন। ই-নামজারির কেস নম্বর বা ডিসিআর হাতে থাকলে সেখানেও দলিলের সূত্র মেলে। এই তথ্য নিয়ে তল্লাশে গেলে অফিসের কাজ অনেক দ্রুত হয়।
৪. মূল দলিল ছাড়া বিক্রি, নামজারি বা ব্যাংক ঋণে কী হবে
যুগান্তরের নভেম্বর ২০২৫-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলিল না থাকলেও পাঁচটি প্রমাণ মালিকানা দেখাতে কাজে লাগে: জরিপের খতিয়ান, নামজারি বা খারিজের রেকর্ড, ভোগদখলের প্রমাণ, খাজনার রশিদ আর ডিসিআর। এর সঙ্গে দলিলের সার্টিফাইড কপি থাকলে আপনার অবস্থান আরও শক্ত হয়।
- জমি বিক্রি: ক্রেতা ও দলিল লেখক সাধারণত মালিকানার ধারাবাহিকতা দেখতে চান। নকল, নামজারি খতিয়ান আর হালনাগাদ খাজনার রশিদ দেখান, জিডির কপিও সঙ্গে রাখুন।
- নামজারি: ই-নামজারিতে দলিলের কপি আপলোড করতে হয়। সার্টিফাইড কপি জমা দেওয়া যাবে কি না, আবেদনের আগে ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসে নিশ্চিত হয়ে নিন।
- ব্যাংক ঋণ: জমি বন্ধক রাখতে ব্যাংক মূল দলিল চায় অনেক সময়। মূল না থাকলে তারা কোন কাগজ গ্রহণ করবে, ব্যাংকের আইন বিভাগের কাছে আগে জেনে নিন।
দলিল হারানোর সুযোগে কেউ জমি দাবি করলে বা জাল দলিল দেখালে নিজে সমাধান খুঁজবেন না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. আবার যেন না হারায়: কাগজ রাখবেন যেভাবে
- মূল দলিল, নামজারি খতিয়ান, ডিসিআর আর খাজনার রশিদের স্পষ্ট ছবি তুলে নিজের ইমেইলে বা ক্লাউডে রাখুন।
- মূল কাগজ পানি না ঢোকে এমন প্লাস্টিক ফাইলে রাখুন, আর পরিবারের একজনকে জানিয়ে রাখুন কোথায় আছে।
- দলিল রেজিস্ট্রির পর মূল দলিল তুলতে দেরি করবেন না। রশিদ হারালে দলিল তোলাও জটিল হয়।
- ঘর বদলের সময় জমির সব কাগজ একসঙ্গে আলাদা ব্যাগে রাখুন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
জমির দলিল হারিয়ে গেলে কিভাবে পাওয়া যাবে?
দলিল হারালে কি জিডি করা বাধ্যতামূলক?
jomir dolil hariye gele ki korbo, সার্টিফাইড কপি কি মূল দলিলের সমান?
দলিলের নকল পেতে কত দিন লাগে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।