ভূমি ও নামজারি

সিএস, এসএ, আরএস আর বিএস খতিয়ান কী, কোনটা কত সালে হয়েছে আর দেখে চিনবেন যেভাবে

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
সিএস, এসএ, আরএস আর বিএস খতিয়ান কী, কোনটা কত সালে হয়েছে আর দেখে চিনবেন যেভাবে

সংক্ষেপে

সিএস খতিয়ান হলো ব্রিটিশ আমলের ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা প্রথম পূর্ণাঙ্গ জরিপের খতিয়ান। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্যে এর কাজ ১৮৮৮ সালে কক্সবাজারের রামুতে শুরু হয়ে ১৯৪০ সালে দিনাজপুরে শেষ হয়েছে। এরপর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সালে এসএ, ১৯৬৫-৬৬ থেকে আরএস, ঢাকায় সিটি জরিপ আর ২০১৩ থেকে ডিজিটাল বা বিএস জরিপ হয়েছে।

চারটি খতিয়ান দেখতে প্রায় একই রকম হলেও কাগজের দিক, পৃষ্ঠার সংখ্যা আর ওপরে লেখা কয়েকটি শব্দ দেখে চেনা যায়। কোন খতিয়ান কার নামে, কোন দাগে, তা বুঝতে এই পার্থক্য জানা থাকলে জমি কেনা বা নামজারির কাগজ মেলানো অনেক সহজ হয়।

অনলাইনে খতিয়ান খুঁজুন

জরিপের ধরন, মৌজা আর খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে সরকারি পোর্টালে খতিয়ান দেখা যায়।

খতিয়ান দেখুন
এই লেখায়
  1. সিএস খতিয়ান কি, কত সালে হয়েছে
  2. এসএ খতিয়ান কি, কেন এতে ভুল বেশি পাওয়া যায়
  3. আর এস খতিয়ান কি, কত সালে হয়, আর বিএস খতিয়ান কোনটা
  4. সিএস খতিয়ান চেনার উপায়: কাগজ দেখে কোনটা কোন খতিয়ান
  5. সিএস খতিয়ান অনলাইনে কোথায় পাওয়া যাবে
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. সিএস খতিয়ান কি, কত সালে হয়েছে

১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন পাস হওয়ার পর প্রজাদের স্বত্ব লিখে রাখতে ১৮৮৮ সালে ভূমি রেকর্ড দপ্তর তৈরি হয়। সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সহায়তায় কক্সবাজারের রামু থানায় প্রথম জরিপ আর খতিয়ান তৈরির কাজ শুরু হয়, শেষ হয় ১৮৯০ সালে। তারপর চট্টগ্রাম জেলায় ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে চলে ১৮৯৮ পর্যন্ত।

এরপর গোটা পূর্ব বাংলায় সিএস জরিপ হয় এবং ১৯৪০ সালে দিনাজপুরে গিয়ে শেষ হয়। তাই কোনো জেলার সিএস খতিয়ান কত সালের, তা জেলা ভেদে আলাদা। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, বৃহত্তর সিলেট তখন আসাম প্রদেশে থাকায় সেখানে সিএস জরিপ হয়নি। সিলেটের কেউ সিএস খতিয়ান খুঁজে না পেলে কারণ এটাই।

জমির কাগজে প্রায়ই লেখা থাকে ‘সিএস ১২৪ নং খতিয়ান, আরএস ৩১০ নং খতিয়ান’। একই জমির জন্য দুই জরিপে দুই রকম নম্বর হয়েছে বলেই এমন লেখা। কোন খতিয়ান কোন সময়ের, তা জানা থাকলে বোঝা যায় পুরোনো মালিক কে ছিলেন আর পরে কার নামে রেকর্ড হয়েছে। জমি কেনার আগে মালিকানার ধারাবাহিকতা মেলাতে এটাই প্রথম কাজ।

সিএস খতিয়ানে জমিদারের নাম কেন

সিএস জরিপের সময় জমিদারি প্রথা চালু ছিল। তাই এই খতিয়ানে জমিটি কোন জমিদারের অধীনে আর কোন প্রজা দখলে ছিলেন, দুটো নামই লেখা থাকে।

২. এসএ খতিয়ান কি, কেন এতে ভুল বেশি পাওয়া যায়

জমিদারি প্রথা তুলে দিতে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পাস হয়, গেজেটে আসে ১৯৫১ সালের ১৬ মে। এই আইনে জমিদারি অধিগ্রহণ করে প্রজার নামে খতিয়ান খোলা হয়। এসএ জরিপ শুরু হয় ১৯৫৬ সালের ১৪ এপ্রিল, শেষ হয় ১৯৬৩ সালে।

অধিদপ্তরের নিজের ভাষায়, এসএ কোনো মাঠ পর্যায়ের সরেজমিন জরিপ ছিল না। জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা জমিদারের কাচারিতে বসে পত্তন রেজিস্টার দেখে খতিয়ান লিখেছিলেন। এ কারণে এসএ খতিয়ানের নাম বা পরিমাণ মাঠের সঙ্গে না মেলার ঘটনা বেশি। দলিলে এসএ দাগ উল্লেখ থাকলে আরএস খতিয়ানের সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা ভালো।

একটি উদাহরণ ধরা যাক। দাদার নামে সিএস খতিয়ানে ১ একর জমি, অথচ এসএ খতিয়ানে লেখা ৮০ শতাংশ আর মালিকের নামের বানানও আলাদা। এমন হলে আতঙ্কিত না হয়ে পরের আরএস খতিয়ান আর সেই সময়ের দলিল মিলিয়ে দেখুন। কোথায় ভুল ঢুকেছে, সেটা বোঝার পর সংশোধনের পথ ঠিক করা যায়।

৩. আর এস খতিয়ান কি, কত সালে হয়, আর বিএস খতিয়ান কোনটা

এসএ খতিয়ানের ভুল শোধরাতে তার পরপরই আবার সংশোধনী জরিপ শুরু হয়, যাকে রিভিশনাল সার্ভে বা আরএস বলে। ১৯৬৫-৬৬ সালে রাজশাহী জেলায় এর কাজ শুরু। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, সিলেট, খুলনা আর বরিশাল জোনে এই জরিপ এখনো চলছে। ফলে আরএস খতিয়ান কত সালে হয়, তার একটি উত্তর নেই; আপনার মৌজায় কবে চূড়ান্ত হয়েছে, উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস বলতে পারবে।

  • সিটি বা মহানগর জরিপ: শুধু ঢাকা মহানগর এলাকার মৌজায় হয়েছে। এটিও সংশোধনী জরিপ, তবে নতুন মৌজা ম্যাপ তৈরি হয়েছে।
  • বিএস বা ডিজিটাল জরিপ: ২০১৩ সাল থেকে জিএনএসএস, ইটিএস আর ড্রোন দিয়ে প্রতিটি দাগের বাঁকের স্থানাঙ্ক মেপে নতুন নকশা আর খতিয়ান তৈরি হচ্ছে। অনেক জায়গায় একে বিআরএস বা বাংলাদেশ সার্ভে বলা হয়।
  • দিয়ারা জরিপ: নদীভাঙা আর নতুন জেগে ওঠা চরের জমির জন্য ১৯৬৩ সালে স্থায়ী দিয়ারা সেটেলমেন্ট অফিস হয়েছে।

৪. সিএস খতিয়ান চেনার উপায়: কাগজ দেখে কোনটা কোন খতিয়ান

যুগান্তরের জানুয়ারি ২০২৬-এর একটি প্রতিবেদনে কাগজের ধরন দেখে খতিয়ান চেনার কয়েকটি চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। হাতে পুরোনো খতিয়ান থাকলে নিচের সারণির সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

খতিয়ানকাগজের ধরনযে চিহ্ন দেখবেন
সিএসদুই পৃষ্ঠার, লম্বালম্বিপ্রথম পৃষ্ঠায় জমিদার ও প্রজার নাম, অন্য পৃষ্ঠায় ‘উত্তর সীমানা’ নামে কলাম
এসএএক পৃষ্ঠার, আড়াআড়িডান পাশে সাবেক সিএস খতিয়ান আর হাল নম্বর, ওপরে ‘রে: সা: নং’ লেখা থাকে না
আরএসহাতে লেখা, লম্বালম্বিএকদম ওপরে ডান পাশে ‘রেসার্ভে নং’ লেখা
সিটি জরিপআড়াআড়িপুরোটা কম্পিউটারে টাইপ করা
বিএস বা বিআরএসআড়াআড়িকম্পিউটারে ছাপা, দেখতে অনেকটা সিটি জরিপের মতো

খতিয়ানের ফটোকপি অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে, ওপরের অংশ কেটে যায়। তখন কাগজের দিক আর কলামের বিন্যাস দেখেই প্রথম ধারণা নিন, তারপর মৌজা আর খতিয়ান নম্বর দিয়ে অনলাইনে বা রেকর্ড রুমে মূল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হোন।

দাগ নম্বর জরিপভেদে বদলায়

একই জমির সিএস দাগ আর আরএস দাগ আলাদা হতে পারে। দলিলে যে জরিপের দাগ লেখা, সেই জরিপের খতিয়ানই খুঁজুন, না হলে ভুল জমি মিলিয়ে বসবেন।

৫. সিএস খতিয়ান অনলাইনে কোথায় পাওয়া যাবে

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবা পোর্টালে জরিপের ধরন বেছে খতিয়ান খোঁজা যায়। সব মৌজার পুরোনো খতিয়ান এখনো আপলোড হয়নি, তবু আগে অনলাইনে দেখে নেওয়াই সহজ।

  • ১
    পোর্টাল খুলুনdlrms.land.gov.bd খুলে সার্ভে খতিয়ান অংশে যান।
  • ২
    এলাকা আর জরিপ বাছুনবিভাগ, জেলা, উপজেলা দিয়ে জরিপের ধরন থেকে সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস বেছে নিন, তারপর মৌজা। একই নামের মৌজা থাকলে জেএল নম্বর মিলিয়ে নিন।
  • ৩
    নম্বর দিয়ে খুঁজুনখতিয়ান নম্বর না জানলে দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে খোঁজার অপশন ব্যবহার করুন।
  • ৪
    কপি নিনদেখে মিললে অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপির আবেদন করুন। ফি আর ধাপ আমাদের খতিয়ান তোলার গাইডে আছে।

অনলাইনে না পেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুম বা উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে মৌজার নাম, জেএল নম্বর আর জরিপের নাম নিয়ে খোঁজ নিন। খতিয়ান নিয়ে বিরোধ থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

সিএস খতিয়ান কত সালে হয়?
সিএস জরিপ ১৮৮৮ সালে রামুতে শুরু হয়ে ১৯৪০ সালে দিনাজপুরে শেষ হয়। জেলা ভেদে সাল আলাদা, তাই আপনার খতিয়ানের সাল তার ওপরেই লেখা থাকে বা রেকর্ড রুমে জানা যায়।
বিএস খতিয়ান কি, আর এটা কত সালে হয়?
বিএস বা ডিজিটাল জরিপ হলো সবচেয়ে নতুন জরিপ, যা ২০১৩ সাল থেকে আধুনিক যন্ত্রে চলছে। সব এলাকায় এখনো শেষ হয়নি, আপনার মৌজায় চূড়ান্ত হয়েছে কি না উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে জানুন।
rs khatian আর সিএস খতিয়ানের মধ্যে কোনটা বেশি কাজে লাগে?
যেখানে আরএস চূড়ান্ত হয়েছে, সেখানে সাধারণত আরএসই চলতি রেকর্ড হিসেবে কাজে লাগে। পুরোনো মালিকানার সূত্র খুঁজতে সিএস দরকার হয়, তাই জমি কেনার আগে দুটোই মিলিয়ে দেখা ভালো।
সিলেটে সিএস খতিয়ান পাওয়া যায় না কেন?
সিএস জরিপের সময় বৃহত্তর সিলেট আসাম প্রদেশের অংশ ছিল, তাই সেখানে এই জরিপ হয়নি বলে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর জানিয়েছে। সিলেটে পরের জরিপের খতিয়ান দেখতে হবে।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন