ভূমি ও নামজারি

দাদার সম্পত্তি কি নাতি পাবে: বাবা আগে মারা গেলে এতিম নাতি-নাতনির অংশ, আইনের ৪ ধারা আর হিসাব

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
দাদার সম্পত্তি কি নাতি পাবে: বাবা আগে মারা গেলে এতিম নাতি-নাতনির অংশ, আইনের ৪ ধারা আর হিসাব

সংক্ষেপে

হ্যাঁ, দাদার সম্পত্তি নাতি পাবে, যদি দাদার মৃত্যুর আগে বাবা মারা গিয়ে থাকেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৪ ধারা বলে, বাবা বেঁচে থাকলে যে অংশ পেতেন, তাঁর সন্তানেরা ঠিক সেই অংশ পাবে।

নিয়মটি মেয়ের সন্তানদের বেলাতেও খাটে, অর্থাৎ মা আগে মারা গেলে নানার সম্পত্তিতে নাতি-নাতনি মায়ের অংশ পায়। বাবা বেঁচে থাকলে নাতি সরাসরি দাদার ওয়ারিশ হয় না, তখন সম্পত্তি আসে বাবার মাধ্যমে।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১

উত্তরাধিকার নিয়ে ৪ ধারার পুরো ইংরেজি পাঠ আইন মন্ত্রণালয়ের সাইটে।

৪ ধারা পড়ুন
এই লেখায়
  1. বাবা আগে মারা গেলে দাদার সম্পত্তি কি নাতি পাবে
  2. দাদার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: একটি উদাহরণ
  3. নানার সম্পত্তিতে নাতি আর দাদার সম্পত্তিতে নাতনির অধিকার
  4. নাতি হিসেবে দাদার সম্পত্তি নামজারি করবেন যেভাবে
  5. ওয়ারিশ সনদে নাতি-নাতনির নাম না থাকলে
  6. চাচারা অংশ না দিলে কী করবেন
  7. অনেকে যা জানতে চান

১. বাবা আগে মারা গেলে দাদার সম্পত্তি কি নাতি পাবে

গ্রামে প্রায়ই শোনা যায়, দাদা বেঁচে থাকতে বাবা মারা গেছেন, তাই নাতি-নাতনি দাদার জমির কিছুই পাবে না। এই কথা নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিরোধ হয়। বাংলাদেশে মুসলিমদের জন্য আইন এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট।

বাংলাদেশের আইনে কথাটা ঠিক নয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ আগে মারা যাওয়া সন্তানের ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা বিধান করেছে, যাতে চাচা-ফুফু জীবিত থাকলেও তারা বঞ্চিত না হয়। তাই কেউ মুখে মুখে বললেই অংশ ছেড়ে দেবেন না, আগে আইনের ধারাটি দেখে নিন।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারায় লেখা আছে, উত্তরাধিকার খোলার আগে, মানে দাদার মৃত্যুর আগে, কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে তাঁর যে সন্তানেরা দাদার মৃত্যুর সময় বেঁচে আছে, তারা per stirpes ভাগ পাবে। সেই ভাগ ঠিক ততটা, যতটা মৃত ছেলে বা মেয়ে বেঁচে থাকলে পেতেন।

অধ্যাদেশ অন্য প্রথার ওপরে

অধ্যাদেশের ৩ ধারা বলছে, অন্য কোনো আইন, প্রথা বা রীতিতে যা-ই থাকুক, এর বিধান কার্যকর হবে। ১ ধারা অনুযায়ী এটি বাংলাদেশের সব মুসলিম নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য, তাঁরা যেখানেই থাকুন।

২. দাদার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: একটি উদাহরণ

ধরুন, নোয়াখালীর আবদুর রহমান মারা গেলেন। তাঁর তিন ছেলে: সালাম, করিম আর জামিল। সালাম মারা গেছেন বাবার কয়েক বছর আগে, রেখে গেছেন ছেলে রাফিকে। সহজ রাখতে ধরে নিই, রহমানের স্ত্রী, মেয়ে বা বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই।

মুসলিম উত্তরাধিকারে নির্দিষ্ট অংশীদারের ভাগ দেওয়ার পর ছেলেরা বাকিটা পায়, আর ভাইয়েরা সমান পায়। সালাম বেঁচে থাকলে তিন ভাই প্রত্যেকে এক-তৃতীয়াংশ পেতেন। ৪ ধারা অনুযায়ী সালামের সেই এক-তৃতীয়াংশ পাবে রাফি।

ওয়ারিশঅংশকারণ
করিম (ছেলে)১/৩জীবিত ছেলে
জামিল (ছেলে)১/৩জীবিত ছেলে
রাফি (সালামের ছেলে)১/৩৪ ধারায় বাবার অংশ

আসল পরিবারে স্ত্রী, মেয়ে বা বাবা-মা বেঁচে থাকলে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট অংশ আগে বাদ যায়, তাই অঙ্ক বদলে যায়। মৃত ছেলের একাধিক সন্তান থাকলে তাঁর অংশ তারা নিজেদের মধ্যে কীভাবে ভাগ করবে, সেটা পারিবারিক হিসাব দেখে আইনজীবীর কাছ থেকে লিখিত হিসাব নিন।

৩. নানার সম্পত্তিতে নাতি আর দাদার সম্পত্তিতে নাতনির অধিকার

  • ৪ ধারায় ছেলে আর মেয়ে দুটোই বলা আছে। তাই মা নানার আগে মারা গেলে নানার সম্পত্তিতে মায়ের অংশ পাবে তাঁর সন্তানেরা।
  • নাতনিও নাতির মতো বাবার অংশের দাবিদার। ধারায় সন্তানদের কথা বলা হয়েছে, ছেলে বা মেয়ে আলাদা করা হয়নি।
  • বাবা বা মা দাদা-নানার মৃত্যুর সময় বেঁচে থাকলে ৪ ধারা খাটে না। তখন সম্পত্তি প্রথমে বাবা বা মায়ের নামে আসে, পরে তাঁদের মৃত্যুর পর সন্তানেরা পায়।
  • অধ্যাদেশটি মুসলিমদের জন্য। হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান পরিবারের উত্তরাধিকারে আলাদা নিয়ম চলে, সে ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৪. নাতি হিসেবে দাদার সম্পত্তি নামজারি করবেন যেভাবে

  • ১
    ওয়ারিশ সনদে নাম তোলানইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে দাদার ওয়ারিশ সনদ নিন। মৃত চাচা বা বাবার জায়গায় তাঁর সন্তানদের নাম আছে কি না দেখে নিন।
  • ২
    খতিয়ান আর দলিল জোগাড় করুনদাদার নামের খতিয়ান অনলাইনে খুঁজে কপি তুলুন। কেনা জমি হলে দলিলের সার্টিফায়েড কপি রাখুন।
  • ৩
    আপসে বণ্টন বা সরাসরি নামজারিসব ওয়ারিশ রাজি হলে বণ্টননামা করে বা ওয়ারিশ সূত্রে ই-নামজারির আবেদন করুন, নিজের অংশ আলাদা জোতে আনুন।
  • ৪
    রাজি না হলে আদালতচাচারা ভাগ দিতে অস্বীকার করলে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করা যায়।
দলিলে সই দেওয়ার আগে দেখুন

কেউ না দাবি বা হেবা দলিলে সই চাইলে আগে দেখুন তাতে আপনার অংশ ছেড়ে দেওয়ার কথা আছে কি না। সই করে দিলে পরে ফেরানো কঠিন।

৫. ওয়ারিশ সনদে নাতি-নাতনির নাম না থাকলে

সমস্যা সবচেয়ে বেশি হয় ওয়ারিশ সনদে। অনেক সময় দাদার ওয়ারিশ হিসেবে শুধু জীবিত ছেলেমেয়েদের নাম লেখা হয়, মৃত ছেলের সন্তানদের নাম বাদ পড়ে। পরে সেই সনদ দিয়েই নামজারি হয়ে যায়, আর নাতির অংশ চাচাদের নামে চলে যায়।

সনদ হাতে পেলে মিলিয়ে নিন

নামজারির শুনানিতে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ৪ ধারার কথা লিখিতভাবে জানাতে পারেন। আপনার বাবার মৃত্যু সনদ এখানে সবচেয়ে কাজের কাগজ, কারণ এটাই প্রমাণ করে তিনি দাদার আগে মারা গেছেন।

৬. চাচারা অংশ না দিলে কী করবেন

প্রথমে পরিবারে বসে ৪ ধারার কথাটি দেখান, অনেক সময় এতেই মিটে যায়। না মিটলে ইউনিয়ন পরিষদের সালিশ বা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতা চাইতে পারেন, সরকারি লিগ্যাল এইডের হেল্পলাইন ১৬৬৯৯।

রেকর্ডে ভুলভাবে চাচাদের নামে পুরো জমি উঠে গেলে উপজেলা ভূমি অফিসে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে নামজারি বাতিল বা সংশোধনের আবেদন করা যায়। মালিকানা নিয়েই বিরোধ থাকলে আদালত ছাড়া পথ নেই, তখন একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।

৭. অনেকে যা জানতে চান

দাদার সম্পত্তি কি নাতি পাবে?
দাদার আগে বাবা মারা গেলে পাবে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারায়। বাবা বেঁচে থাকলে যে অংশ পেতেন, নাতি-নাতনি ঠিক সেই অংশ পায়।
দাদার সম্পত্তিতে নাতনির অধিকার আছে কি?
আছে। ৪ ধারায় মৃত ছেলে বা মেয়ের সন্তানদের কথা বলা হয়েছে, নাতি-নাতনি দুজনই এর আওতায়। নিজেদের মধ্যে ভাগের হিসাব আইনজীবীর কাছ থেকে লিখিত নিন।
nanar sompottite natir odhikar ache ki?
নানার আগে মা মারা গেলে আছে। ৪ ধারা ছেলে ও মেয়ে দুজনের সন্তানের ক্ষেত্রেই খাটে, তাই মা বেঁচে থাকলে যা পেতেন, সন্তানেরা তা পায়।
বাবা বেঁচে আছেন, তাহলে কি আমি দাদার সম্পত্তি পাব?
সরাসরি না। তখন দাদার মৃত্যুর পর সম্পত্তি আপনার বাবার নামে আসে, বাবার মৃত্যুর পর আপনি তাঁর ওয়ারিশ হিসেবে পান।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন