
সংক্ষেপে
জমা খারিজ আর নামজারি মুখের ভাষায় একই কাজ: আগের মালিকের নাম খতিয়ান থেকে বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম তোলা। ইংরেজিতে Mutation। তবে নামজারির আবেদনে প্রায়ই সঙ্গে আরেকটা কাজ হয়, জমাভাগ, মানে একটি যৌথ জোত ভেঙে আপনার অংশের আলাদা খতিয়ান খোলা।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারায় রেকর্ড হালনাগাদের দুটো কারণ আলাদা করে লেখা আছে: হস্তান্তর বা উত্তরাধিকারের ফলে নামজারি, আর জোতের বিভাজন, একত্রীকরণ বা সংহতি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হার অনুযায়ী নামজারিতে সরকারি খরচ মোট ১,১৭০ টাকা।
নামজারি, জমাভাগ আর আবেদনের অবস্থা অনলাইনে দেখার ভূমি মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা।
এই লেখায়
১. খারিজ ও নামজারির মধ্যে পার্থক্য কি
গ্রামে কেউ বলেন জমি খারিজ করেছি, কেউ বলেন নামজারি, শহরে বলে মিউটেশন। জমি কিনে দলিল হাতে পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম তোলার কাজকেই সবাই বোঝান। তিনটা শব্দ আলাদা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে কাজ একটাই।
শব্দের ভেতরে একটু তফাত আছে। খারিজ মানে বাদ দেওয়া, অর্থাৎ আগের মালিকের নাম কাটা। নামজারি মানে নতুন নাম চালু করা। একটা ছাড়া আরেকটা হয় না, তাই এক আবেদনেই দুটো হয়। আলাদা করে খারিজের আবেদন বলে কিছু নেই।
| শব্দ | মানে | কখন |
|---|---|---|
| নামজারি বা মিউটেশন | নতুন মালিকের নাম খতিয়ানে তোলা | কেনা, দান, উত্তরাধিকার বা আদালতের ডিক্রির পর |
| জমা খারিজ | আগের মালিকের জমা থেকে নাম ও জমি বাদ দেওয়া | নামজারির সঙ্গেই |
| জমাভাগ | একটি যৌথ জোত ভেঙে আলাদা জোত ও খতিয়ান | দাগের পুরোটা নয়, অংশ কিনলে বা ওয়ারিশরা ভাগ করলে |
| জমা একত্রীকরণ | একই মৌজায় একজনের কয়েকটি জোত এক করা | একই মালিকের ছড়ানো জমি এক খতিয়ানে আনতে |
২. নামজারি জমাভাগ কি, আইন কী বলে
ধরুন, যশোরের আবুল কাশেম একটা খতিয়ানের ১০০ শতাংশের মধ্যে ২০ শতাংশ কিনলেন। শুধু নাম তুললে হবে না, কারণ খতিয়ানটা বিক্রেতার পুরো জোতের। তাঁর ২০ শতাংশ আলাদা করে নতুন জোত খুলতে হবে, যাতে খাজনাও আলাদা হয়। এটাই জমাভাগ। দুটো কাজ একসঙ্গে হয় বলে লোকমুখে প্রায়ই বলা হয় নামজারি ও জমাভাগ।
আইনের ভিত্তি রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০। এর ১১৭ ধারা বলছে, এক বা একাধিক যৌথ মালিকের আবেদনে রাজস্ব কর্মকর্তা যৌথ জোত ভাগ করে খাজনাও ভাগ করে দিতে পারেন, তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে যুক্তিসংগত নোটিশ দিয়ে শুনানির পরই আদেশ হবে। ভাগ মাঠে চিহ্নিত করা আর নকশায় দেখানো যায়, সেটাও একই ধারায় আছে।
১১৬ ধারা উল্টো দিকের কাজ: একই গ্রামে একজনের কয়েকটি আলাদা জোত থাকলে রাজস্ব কর্মকর্তার আদেশে সেগুলো এক জোতে একত্র করা যায়। আর ১৪৩ ধারায় কালেক্টরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, নামজারি, জোতের বিভাজন বা একত্রীকরণের ফলে রেকর্ড হালনাগাদ রাখতে।
৩. খারিজ করতে কত টাকা লাগে
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবার নির্ধারিত ফির পাতায় মিউটেশনের খরচ ভাগ ভাগ করে দেওয়া আছে। জমাভাগ আলাদা করে ফি নেয় কি না, সে পাতায় আলাদা লাইন নেই।
| খরচের খাত | সরকারি ফি | কখন দেবেন |
|---|---|---|
| আবেদনের কোর্ট ফি | ২০ টাকা | আবেদনের সময় |
| নোটিশ জারি ফি | ৫০ টাকা | আবেদনের সময় |
| ডিসিআর ফি | ১,১০০ টাকা | আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর |
| মোট | ১,১৭০ টাকা | |
| রিভিউ আবেদনের কোর্ট ফি ও নোটিশ জারি | ৭০ টাকা | নামঞ্জুর আদেশ রিভিউ করাতে চাইলে |
| রিভিউ ডিসিআর ফি | ১,১০০ টাকা | রিভিউতে মঞ্জুর হলে |
সরকারি খরচ এই কয়েকটি খাতেই। অফিসে কেউ দ্রুত করে দেওয়ার কথা বলে বাড়তি টাকা চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা ভূমি মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ ব্যবস্থায় জানান।
৪. খারিজ আর খতিয়ান কি এক, খারিজ খতিয়ান চেনার উপায়
খতিয়ান হলো রেকর্ড, খারিজ হলো সেই রেকর্ড বদলানোর কাজ। খারিজ বা নামজারি শেষ হলে আপনি যে নতুন খতিয়ান পান, মানুষ সেটাকেই বলে খারিজ খতিয়ান বা নামজারি খতিয়ান। আর মাঠ জরিপে তৈরি সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস খতিয়ান জরিপের রেকর্ড, নামজারির নয়।
- ডিসিআর হলো নামজারির ১,১০০ টাকা ফি দেওয়ার রসিদ। নামজারি খতিয়ানের সঙ্গে এটা যত্ন করে রাখুন, হারালে আবার তুলতে ঝামেলা।
- জমাভাগ হলে আপনার অংশের জন্য আলাদা জোত খোলে, তাই আপনার খতিয়ান আর বিক্রেতার খতিয়ান আলাদা হয়ে যায়।
- নামজারির পর ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) দিতে হয় নিজের নামের হোল্ডিংয়ে।
- আবেদনের অবস্থা আর খতিয়ান আসল কি না দেখার সোজা পথ ই-নামজারি পোর্টাল বা উপজেলা ভূমি অফিস।
নামজারি খতিয়ানের কাগজে ঠিক কোন কোন ঘর থাকে, তার কোনো সরকারি নমুনা ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পাতায় আমরা দেখতে পাইনি। সন্দেহ হলে উপজেলা ভূমি অফিসে খতিয়ান মিলিয়ে নিন।
৫. জমা খারিজ না করলে কি হয়
দলিল রেজিস্ট্রি হলে মালিকানা বদলায়, কিন্তু সরকারি রেকর্ডে আগের মালিকের নামই থেকে যায়। ফলে খাজনা দেওয়া, পরে বিক্রি বা ব্যাংকে বন্ধক রাখার সময় প্রশ্ন ওঠে, আর আগের মালিকের ওয়ারিশরা দাবি তুললে প্রমাণ দুর্বল হয়ে যায়। ধরুন, কয়েক বছর পর আপনি জমিটা বেচতে চাইলেন। ক্রেতা প্রথমেই দেখতে চাইবেন খতিয়ানে কার নাম আর খাজনা কার নামে দেওয়া।
- ১দলিল আর আগের খতিয়ান গুছিয়ে নিনরেজিস্ট্রি দলিল বা উত্তরাধিকারের কাগজ, বিক্রেতার নামে থাকা খতিয়ান আর খাজনার রসিদ।
- ২ই-নামজারিতে আবেদন করুনপোর্টালে নামজারির আবেদন করুন, অংশ কিনলে জমাভাগের তথ্যও দিন। ২০ টাকা কোর্ট ফি আর ৫০ টাকা নোটিশ ফি দিন।
- ৩শুনানিতে হাজির থাকুনসহকারী কমিশনার (ভূমি) শুনানির তারিখ দিলে মূল কাগজ নিয়ে যান।
- ৪ডিসিআর ফি দিয়ে খতিয়ান নিনমঞ্জুর হলে ১,১০০ টাকা ডিসিআর ফি দিয়ে নতুন খতিয়ান নামান।
নামজারি নামঞ্জুর হলে বা ভুল হলে রিভিউয়ের পথ আছে, ফির হিসাব ওপরের ছকে। জমির বিরোধ বা ওয়ারিশদের মধ্যে আপত্তি থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে বা একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
জমা খারিজ আর নামজারি কি এক?
নামজারি জমাভাগ কি?
খারিজ করতে কত টাকা লাগে?
kharij ar khatian ki ek?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।