
সংক্ষেপে
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নিতে জমি বা ফ্ল্যাট বন্ধক রাখলে যে রেজিস্ট্রি দলিল হয়, সেটাই বন্ধকী বা মর্টগেজ দলিল। নিবন্ধন অধিদপ্তরের হার তালিকায় এই দলিলে ঋণ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে স্ট্যাম্প শুল্ক ২,০০০ টাকা, ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি পর্যন্ত ৫,০০০ টাকা, আর নিবন্ধন ফি ঋণের অঙ্কের ধাপে ২০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে।
লোন পুরো শোধ হলে সম্পত্তি দায়মুক্ত করতে আলাদা রিডেম্পশন বা পুনঃসমর্পণ দলিল রেজিস্ট্রি করতে হয়, যাতে স্ট্যাম্প শুল্ক ৫০০ টাকা আর ই ফি ১০০ টাকা। আইন অনুযায়ী তখন ব্যাংক আপনার মূল দলিল আর সব কাগজ ফেরত দিতে বাধ্য।
বন্ধকী দলিল, রিডেম্পশন দলিল আর পাওয়ার অব অ্যাটর্নির সরকারি হার এই তালিকায় আছে।
এই লেখায়
১. বন্ধকী দলিল বা মর্টগেজ দলিল কি
ধরুন রহিম সাহেব ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা লোন নেবেন, জামানত হিসেবে নিজের ১০ শতাংশ জমি দেবেন। জমিটা তাঁর দখলেই থাকবে, কিন্তু লোন শোধ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের একটা অধিকার থাকবে। এই অধিকার লিখিতভাবে তৈরি হয় বন্ধকী দলিলে, যাকে মর্টগেজ দলিলও বলে।
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭(১)(গগ) ধারায় সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৯ ধারার বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করা আছে। তাই ব্যাংকের এই দলিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন হয়, আর তার খরচ সাধারণত ঋণগ্রহীতাকেই দিতে হয়।
গ্রামে টাকা নিয়ে জমির দখল আর ফসল ভোগ করতে দেওয়ার যে বন্ধক, সেটা খাই খালাসি বা কট কবলা। তার নিয়ম আলাদা, মেয়াদও আইনে বাঁধা। এই লেখা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দখল না দিয়ে রাখা বন্ধক নিয়ে।
২. বন্ধকী দলিলের খরচ কত
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত হার তালিকার ১০ নম্বর সারি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বন্ধকী দলিলের জন্য। এখানে হিসাব হয় ঋণের অঙ্ক ধরে।
| খাত | ঋণের অঙ্ক | সরকারি হার |
|---|---|---|
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত | ২,০০০ টাকা |
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি | ৫,০০০ টাকা |
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ১ কোটির বেশি | প্রথম ১ কোটিতে ৫,০০০ টাকা, বাকি অঙ্কে ০.১০%; তালিকায় সঙ্গে লেখা '৫ কোটির বেশি নয়', ব্যাখ্যা অফিসে জেনে নিন |
| নিবন্ধন ফি | ৫ লাখের কম | ১%, তবে ২০০ টাকার কম নয়, ৫০০ টাকার বেশি নয় |
| নিবন্ধন ফি | ৫ থেকে ২০ লাখ | ০.২৫%, তবে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার মধ্যে |
| নিবন্ধন ফি | ২০ লাখের বেশি | ০.১০%, তবে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে |
| হলফনামা | সব ক্ষেত্রে | ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প |
| এন ও ই ফি | সব ক্ষেত্রে | সাফ কবলার মতো: ই ফি ১০০ টাকা, এন ফি প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা |
স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর, উৎসে আয়কর আর ভ্যাট এই দলিলে প্রযোজ্য নয় বলে তালিকায় লেখা। ওপরের উদাহরণে রহিম সাহেবের ৩০ লাখ টাকার লোনে স্ট্যাম্প ২,০০০ টাকা আর নিবন্ধন ফি ০.১০% হিসাবে ৩,০০০ টাকা, কারণ এই ধাপে ৩,০০০ টাকার কম নেওয়া হয় না। সঙ্গে হলফনামা আর এন, ই ও এনএন ফি যোগ হবে। চূড়ান্ত অঙ্ক সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মিলিয়ে নিন।
লোনের সঙ্গে ব্যাংকের অনুকূলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করা হলে তারও খরচ আছে। হার তালিকার ১৩ নম্বর সারিতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে স্ট্যাম্প ২,০০০ টাকা আর ই ফি ১০০ টাকা লেখা আছে। আপনার লোনে এটি লাগবে কি না, ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে জেনে নিন।
৩. লোন শোধের পর বন্ধকী দলিল বাতিল করার নিয়ম
লোনের শেষ কিস্তি দিলেই রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড থেকে বন্ধক মুছে যায় না। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৬০ ধারা ঋণগ্রহীতাকে খালাসের অধিকার দেয়: পুরো টাকা দেওয়ার পর তিনি ব্যাংককে বলতে পারেন বন্ধকী দলিল আর সম্পত্তির সব কাগজ ফেরত দিতে, আর তাঁর খরচে হয় সম্পত্তি ফেরত হস্তান্তর করতে, নয়তো বন্ধক নিবন্ধিত হলে লিখিত স্বীকৃতি দিয়ে তা রেজিস্ট্রি করাতে যে ব্যাংকের অধিকার শেষ হয়েছে। বাস্তবে এটাই রিডেম্পশন বা পুনঃসমর্পণ দলিল।
- ১পুরো দায় শোধ করুনসুদ, চার্জসহ লোন হিসাবে কোনো বকেয়া নেই, তা ব্যাংকের স্টেটমেন্টে মিলিয়ে নিন। ঋণ পরিশোধের লিখিত প্রত্যয়ন চেয়ে নিন।
- ২কাগজ ফেরত চানব্যাংকের কাছে থাকা মূল দলিল, বায়া দলিল, খতিয়ান, খাজনার রশিদসহ যা যা জমা দিয়েছিলেন, তালিকা মিলিয়ে বুঝে নিন। জমার সময়ের প্রাপ্তিস্বীকার কপি থাকলে সেটি সঙ্গে নিন।
- ৩রিডেম্পশন দলিল তৈরিব্যাংকের প্রতিনিধি দলিল সম্পাদন করবেন, যাতে লেখা থাকবে বন্ধকের অধিকার শেষ হয়েছে। খসড়ায় আগের বন্ধকী দলিলের নম্বর, তারিখ আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ঠিক আছে কি না দেখুন।
- ৪সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিসম্পত্তি যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এলাকায়, সেখানে রিডেম্পশন দলিল রেজিস্ট্রি করান। আইন অনুযায়ী এই খরচ ঋণগ্রহীতার।
- ৫নিবন্ধিত কপি সংরক্ষণ করুনরিডেম্পশন দলিলের মূল কপি তুলে মালিকানার কাগজের সঙ্গে রাখুন। পরে জমি বিক্রি বা নতুন লোনে এটি চাওয়া হয়।
| রিডেম্পশন বা পুনঃসমর্পণ পত্র | সরকারি হার |
|---|---|
| স্ট্যাম্প শুল্ক | ৫০০ টাকা |
| হলফনামা | ৩০০ টাকা |
| নিবন্ধন ফি | ই ফি ১০০ টাকা, এন ও ই ফি সাফ কবলার মতো |
| স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর, ভ্যাট | প্রযোজ্য নয় |
ব্যাংকের অনুকূলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি থাকলে সেটিও বাতিল করিয়ে নিন। হার তালিকার ১৬ নম্বর সারিতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি রহিতকরণে স্ট্যাম্প ৫০০ টাকা আর ই ফি ১০০ টাকা।
৪. জমি কেনার আগে বন্ধক আছে কি না দেখবেন যেভাবে
বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রি থাকে বলে তল্লাশিতে তা ধরা পড়ে। বিক্রেতা বলছেন লোন শোধ হয়ে গেছে, অথচ রিডেম্পশন দলিল দেখাতে পারছেন না, এমন জমি কেনার আগে সাবধান হন।
কেনার আগে মিলিয়ে নিন
ব্যাংক টাকা নেওয়ার পরও কাগজ ফেরত দিতে বা রিডেম্পশন দলিল করতে গড়িমসি করলে প্রথমে শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে লিখিত আবেদন দিন। তাতে কাজ না হলে খালাসের মামলাসহ পরের পথ নিয়ে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. অনেকে যা জানতে চান
বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রেশন ফি কত?
রিডেমশন দলিল কি?
mortgage dolil er khoroch কে দেয়?
লোন শোধ করলেই কি বন্ধক উঠে যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।