
সংক্ষেপে
ওয়ারিশ বা শরিকেরা আপসে বণ্টননামা করতে রাজি না হলে বাটোয়ারা মামলা করার নিয়ম হলো দেওয়ানি আদালতে আরজি দাখিল করা। আপনার দাবি করা অংশের মূল্য ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে মামলা যায় সিভিল জজ আদালতে, ২৫ লাখ পর্যন্ত সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে, এর বেশি হলে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।
দখল থেকে বাদ পড়ে থাকলে কোর্ট ফি ঠিক হয় আপনার অংশের বাজারমূল্যের ওপর। আইনে মামলা শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় বাঁধা নেই, তবে লিখিত জবাবের পর আদালত মধ্যস্থতায় পাঠায়, আর আপস হলে কোর্ট ফি ফেরত পাওয়া যায়।
যৌথ সম্পত্তি ভাগ না করে বিক্রির আদেশ আর শরিকের কেনার অধিকারের পুরো বিধান আইন মন্ত্রণালয়ের সাইটে।
এই লেখায়
১. বাটোয়ারা মামলা কি, কখন করতে হয়
বাবা মারা যাওয়ার পর জমি সবার নামে এজমালি থাকে। কেউ পুরো জমি চাষ করছেন, কেউ ভাগ পাচ্ছেন না, আবার বসে আলোচনাও এগোচ্ছে না। এই অবস্থায় আদালতের মাধ্যমে নিজের অংশ আলাদা করে নেওয়ার মামলাকে বাটোয়ারা মামলা বলে, ইংরেজিতে partition suit।
সবাই একমত হলে মামলার দরকার নেই। তখন রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা দলিল করেই ভাগ হয়, সেটা নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে। মামলা লাগে তখনই, যখন একজন শরিকও সই দিতে রাজি নন, বা কে কত পাবেন তা নিয়েই বিরোধ।
একটি ধারায় পুরো মামলা চলে না। মামলা হয় দেওয়ানি কার্যবিধি মেনে, আদালত চাইলে বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ অনুযায়ী জমি বিক্রির আদেশ দিতে পারে, আর কোর্ট ফি ঠিক হয় কোর্ট-ফি আইনের ৭ ধারার vi-A দফায়।
২. বাটোয়ারা মামলা কোথায় করতে হয়
দেওয়ানি আদালত আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী আদালত বাছাই হয় মামলার মূল্য দেখে। দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫ ধারা বলে, মামলা করতে হয় সবচেয়ে নিচের যে আদালতের এখতিয়ার আছে সেখানে। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে আদালতের নামও বদলেছে, আগের সহকারী জজ এখন সিভিল জজ।
| মামলার মূল্য | যে আদালতে আরজি | আগের নাম |
|---|---|---|
| ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত | সিভিল জজ আদালত | সহকারী জজ |
| ১৫ লাখের বেশি, ২৫ লাখ পর্যন্ত | সিনিয়র সিভিল জজ আদালত | সিনিয়র সহকারী জজ |
| ২৫ লাখ টাকার বেশি | যুগ্ম জেলা জজ আদালত | একই |
দেওয়ানি কার্যবিধির ১৬ ধারায় স্থাবর সম্পত্তি বাটোয়ারার মামলা করতে হয় জমি যে আদালতের এলাকায়, সেখানে। জমি কয়েক আদালতের এলাকায় ছড়ানো থাকলে ১৭ ধারায় যেকোনো একটির এলাকার আদালতে করা যায়, কোনটিতে করবেন তা আইনজীবী তফসিল দেখে ঠিক করবেন।
৩. বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি কত, খরচ কেমন
কোর্ট-ফি আইনের ৭ ধারার vi-A দফা বলছে, যৌথ সম্পত্তিতে নিজের অংশ আলাদা করে দখলের মামলায় বাদী যদি দখল থেকে বাদ পড়ে থাকেন, তাহলে যে অংশ দাবি করছেন তার বাজারমূল্যের ওপর কোর্ট ফি হবে। হার আইনের প্রথম তফসিলের অ্যাড ভ্যালোরেম ধাপ অনুযায়ী।
আপনি যদি জমির কিছু অংশে দখলে থাকেন, তখন মূল্যায়নের নিয়ম আলাদা হতে পারে। সঠিক অঙ্ক আরজির মূল্যায়ন দেখে আইনজীবী বা আদালতের সেরেস্তা বলবেন, আন্দাজে কোনো অঙ্ক ধরে নেবেন না। কোর্ট ফির বাইরে আইনজীবীর ফি, সমন জারির খরচ, জমি মাপার কমিশনের খরচ আর নকল তোলার খরচ থাকে, এগুলোর কোনো সরকারি নির্ধারিত অঙ্ক পাওয়া যায়নি।
ধরুন, বগুড়ার রোকসানা বেগমের বাবার জমিতে তাঁর অংশ আছে, কিন্তু ভাইয়েরা পুরো জমি দখলে রেখেছেন। রোকসানা দখলে নেই, তাই তাঁর অংশের বাজারমূল্য ধরে কোর্ট ফি দিতে হবে। সেই অংশের মূল্য ১৫ লাখ টাকার মধ্যে হলে মামলা যাবে সিভিল জজ আদালতে।
৪. বাটোয়ারা মামলা করতে কি কি কাগজ লাগে
আইনজীবীর কাছে যাওয়ার আগে গুছিয়ে নিন
দেওয়ানি কার্যবিধির ২০২৬ সালের সংশোধনীতে ২৬ ধারায় যোগ হয়েছে, প্রতিটি আরজিতে তথ্য হলফনামা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। তাই আরজির সঙ্গে হলফনামা লাগবে, আইনজীবী সেটি তৈরি করবেন।
৫. মামলা চলাকালে কী হয়: বিক্রির আদেশ, মধ্যস্থতা আর সময়
- ১আরজি দাখিলসব শরিককে পক্ষ করে, কোর্ট ফি দিয়ে আরজি জমা দিন। আদালত বিবাদীদের সমন পাঠাবে।
- ২লিখিত জবাববিবাদীরা জবাব দেন। কারও অংশ নিয়ে আপত্তি থাকলে এখানেই আসে।
- ৩মধ্যস্থতাদেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯ক ধারায় লিখিত জবাবের পর আদালত নিজে মধ্যস্থতা করবে বা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর কাছে পাঠাবে। সাধারণত ৬০ দিনে শেষ করতে হয়, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন।
- ৪শুনানি ও ডিক্রিআপস না হলে মামলা আগের জায়গা থেকে চলে, সাক্ষ্য শেষে আদালত কার কত অংশ তা ঠিক করে ডিক্রি দেয়।
মধ্যস্থতায় আপস হলে ৮৯ক ধারার ১১ উপধারায় আদালত কোর্ট ফি ফেরতের সনদ দেবে, সনদের ৬০ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। আপসের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন চলে না।
জমি এত ছোট বা শরিক এত বেশি যে ভাগ করা যায় না, এমন হলে বাটোয়ারা আইনের ২ ধারায় অর্ধেক বা বেশি অংশের মালিকেরা চাইলে আদালত বিক্রি করে টাকা ভাগের আদেশ দিতে পারে। ৩ ধারায় অন্য শরিক আদালতের ঠিক করা দামে ওই অংশ কিনে নিতে পারেন। আর পারিবারিক বসতবাড়ির অংশ বাইরের কেউ কিনে মামলা করলে ৪ ধারায় পরিবারের শরিক সেই অংশ কিনে নিতে পারেন।
বাটোয়ারা মামলা কত দিনে শেষ হয়, তার কোনো সময়সীমা আইনে নেই। শরিকের সংখ্যা, আপত্তি আর আপিলের ওপর সময় নির্ভর করে। খরচ চালাতে না পারলে লিগ্যাল এইডের হেল্পলাইন ১৬৬৯৯-এ যোগাযোগ করতে পারেন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
বাটোয়ারা মামলা করতে কত টাকা লাগে?
বাটোয়ারা মামলা কোথায় করতে হয়?
batwara mamla koto dine shesh hoy?
এক শরিক রাজি না হলে কি বণ্টননামা করা যায়?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।