ভূমি ও নামজারি

বাটোয়ারা মামলা করার নিয়ম: কোন আদালতে করবেন, কোর্ট ফি কীভাবে ঠিক হয়, আর কত দিন লাগতে পারে

সম্পাদনা: রিহাত খানপড়তে ৬ মিনিট

হালনাগাদ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২mutation.land.gov.bd
বাটোয়ারা মামলা করার নিয়ম: কোন আদালতে করবেন, কোর্ট ফি কীভাবে ঠিক হয়, আর কত দিন লাগতে পারে

সংক্ষেপে

ওয়ারিশ বা শরিকেরা আপসে বণ্টননামা করতে রাজি না হলে বাটোয়ারা মামলা করার নিয়ম হলো দেওয়ানি আদালতে আরজি দাখিল করা। আপনার দাবি করা অংশের মূল্য ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে মামলা যায় সিভিল জজ আদালতে, ২৫ লাখ পর্যন্ত সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে, এর বেশি হলে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।

দখল থেকে বাদ পড়ে থাকলে কোর্ট ফি ঠিক হয় আপনার অংশের বাজারমূল্যের ওপর। আইনে মামলা শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় বাঁধা নেই, তবে লিখিত জবাবের পর আদালত মধ্যস্থতায় পাঠায়, আর আপস হলে কোর্ট ফি ফেরত পাওয়া যায়।

বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩

যৌথ সম্পত্তি ভাগ না করে বিক্রির আদেশ আর শরিকের কেনার অধিকারের পুরো বিধান আইন মন্ত্রণালয়ের সাইটে।

আইনটি পড়ুন
এই লেখায়
  1. বাটোয়ারা মামলা কি, কখন করতে হয়
  2. বাটোয়ারা মামলা কোথায় করতে হয়
  3. বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি কত, খরচ কেমন
  4. বাটোয়ারা মামলা করতে কি কি কাগজ লাগে
  5. মামলা চলাকালে কী হয়: বিক্রির আদেশ, মধ্যস্থতা আর সময়
  6. অনেকে যা জানতে চান

১. বাটোয়ারা মামলা কি, কখন করতে হয়

বাবা মারা যাওয়ার পর জমি সবার নামে এজমালি থাকে। কেউ পুরো জমি চাষ করছেন, কেউ ভাগ পাচ্ছেন না, আবার বসে আলোচনাও এগোচ্ছে না। এই অবস্থায় আদালতের মাধ্যমে নিজের অংশ আলাদা করে নেওয়ার মামলাকে বাটোয়ারা মামলা বলে, ইংরেজিতে partition suit।

সবাই একমত হলে মামলার দরকার নেই। তখন রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা দলিল করেই ভাগ হয়, সেটা নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে। মামলা লাগে তখনই, যখন একজন শরিকও সই দিতে রাজি নন, বা কে কত পাবেন তা নিয়েই বিরোধ।

বাটোয়ারা মামলা কত ধারায়

একটি ধারায় পুরো মামলা চলে না। মামলা হয় দেওয়ানি কার্যবিধি মেনে, আদালত চাইলে বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ অনুযায়ী জমি বিক্রির আদেশ দিতে পারে, আর কোর্ট ফি ঠিক হয় কোর্ট-ফি আইনের ৭ ধারার vi-A দফায়।

২. বাটোয়ারা মামলা কোথায় করতে হয়

দেওয়ানি আদালত আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী আদালত বাছাই হয় মামলার মূল্য দেখে। দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫ ধারা বলে, মামলা করতে হয় সবচেয়ে নিচের যে আদালতের এখতিয়ার আছে সেখানে। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে আদালতের নামও বদলেছে, আগের সহকারী জজ এখন সিভিল জজ।

মামলার মূল্যযে আদালতে আরজিআগের নাম
১৫ লাখ টাকা পর্যন্তসিভিল জজ আদালতসহকারী জজ
১৫ লাখের বেশি, ২৫ লাখ পর্যন্তসিনিয়র সিভিল জজ আদালতসিনিয়র সহকারী জজ
২৫ লাখ টাকার বেশিযুগ্ম জেলা জজ আদালতএকই

দেওয়ানি কার্যবিধির ১৬ ধারায় স্থাবর সম্পত্তি বাটোয়ারার মামলা করতে হয় জমি যে আদালতের এলাকায়, সেখানে। জমি কয়েক আদালতের এলাকায় ছড়ানো থাকলে ১৭ ধারায় যেকোনো একটির এলাকার আদালতে করা যায়, কোনটিতে করবেন তা আইনজীবী তফসিল দেখে ঠিক করবেন।

৩. বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি কত, খরচ কেমন

কোর্ট-ফি আইনের ৭ ধারার vi-A দফা বলছে, যৌথ সম্পত্তিতে নিজের অংশ আলাদা করে দখলের মামলায় বাদী যদি দখল থেকে বাদ পড়ে থাকেন, তাহলে যে অংশ দাবি করছেন তার বাজারমূল্যের ওপর কোর্ট ফি হবে। হার আইনের প্রথম তফসিলের অ্যাড ভ্যালোরেম ধাপ অনুযায়ী।

আপনি যদি জমির কিছু অংশে দখলে থাকেন, তখন মূল্যায়নের নিয়ম আলাদা হতে পারে। সঠিক অঙ্ক আরজির মূল্যায়ন দেখে আইনজীবী বা আদালতের সেরেস্তা বলবেন, আন্দাজে কোনো অঙ্ক ধরে নেবেন না। কোর্ট ফির বাইরে আইনজীবীর ফি, সমন জারির খরচ, জমি মাপার কমিশনের খরচ আর নকল তোলার খরচ থাকে, এগুলোর কোনো সরকারি নির্ধারিত অঙ্ক পাওয়া যায়নি।

ধরুন, বগুড়ার রোকসানা বেগমের বাবার জমিতে তাঁর অংশ আছে, কিন্তু ভাইয়েরা পুরো জমি দখলে রেখেছেন। রোকসানা দখলে নেই, তাই তাঁর অংশের বাজারমূল্য ধরে কোর্ট ফি দিতে হবে। সেই অংশের মূল্য ১৫ লাখ টাকার মধ্যে হলে মামলা যাবে সিভিল জজ আদালতে।

৪. বাটোয়ারা মামলা করতে কি কি কাগজ লাগে

আইনজীবীর কাছে যাওয়ার আগে গুছিয়ে নিন

দেওয়ানি কার্যবিধির ২০২৬ সালের সংশোধনীতে ২৬ ধারায় যোগ হয়েছে, প্রতিটি আরজিতে তথ্য হলফনামা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। তাই আরজির সঙ্গে হলফনামা লাগবে, আইনজীবী সেটি তৈরি করবেন।

৫. মামলা চলাকালে কী হয়: বিক্রির আদেশ, মধ্যস্থতা আর সময়

  • ১
    আরজি দাখিলসব শরিককে পক্ষ করে, কোর্ট ফি দিয়ে আরজি জমা দিন। আদালত বিবাদীদের সমন পাঠাবে।
  • ২
    লিখিত জবাববিবাদীরা জবাব দেন। কারও অংশ নিয়ে আপত্তি থাকলে এখানেই আসে।
  • ৩
    মধ্যস্থতাদেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯ক ধারায় লিখিত জবাবের পর আদালত নিজে মধ্যস্থতা করবে বা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর কাছে পাঠাবে। সাধারণত ৬০ দিনে শেষ করতে হয়, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন।
  • ৪
    শুনানি ও ডিক্রিআপস না হলে মামলা আগের জায়গা থেকে চলে, সাক্ষ্য শেষে আদালত কার কত অংশ তা ঠিক করে ডিক্রি দেয়।

মধ্যস্থতায় আপস হলে ৮৯ক ধারার ১১ উপধারায় আদালত কোর্ট ফি ফেরতের সনদ দেবে, সনদের ৬০ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। আপসের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন চলে না।

জমি এত ছোট বা শরিক এত বেশি যে ভাগ করা যায় না, এমন হলে বাটোয়ারা আইনের ২ ধারায় অর্ধেক বা বেশি অংশের মালিকেরা চাইলে আদালত বিক্রি করে টাকা ভাগের আদেশ দিতে পারে। ৩ ধারায় অন্য শরিক আদালতের ঠিক করা দামে ওই অংশ কিনে নিতে পারেন। আর পারিবারিক বসতবাড়ির অংশ বাইরের কেউ কিনে মামলা করলে ৪ ধারায় পরিবারের শরিক সেই অংশ কিনে নিতে পারেন।

বাটোয়ারা মামলা কত দিনে শেষ হয়, তার কোনো সময়সীমা আইনে নেই। শরিকের সংখ্যা, আপত্তি আর আপিলের ওপর সময় নির্ভর করে। খরচ চালাতে না পারলে লিগ্যাল এইডের হেল্পলাইন ১৬৬৯৯-এ যোগাযোগ করতে পারেন।

৬. অনেকে যা জানতে চান

বাটোয়ারা মামলা করতে কত টাকা লাগে?
কোর্ট ফি ঠিক হয় আপনার দাবি করা অংশের বাজারমূল্যের ওপর, যদি আপনি দখলের বাইরে থাকেন। এর সঙ্গে আইনজীবী, সমন আর জমি মাপার খরচ আছে, যার সরকারি নির্ধারিত অঙ্ক নেই। মোট অঙ্ক আরজির মূল্যায়ন দেখে আইনজীবী বলবেন।
বাটোয়ারা মামলা কোথায় করতে হয়?
জমি যে এলাকায়, সেখানকার দেওয়ানি আদালতে। অংশের মূল্য ১৫ লাখ পর্যন্ত সিভিল জজ, ২৫ লাখ পর্যন্ত সিনিয়র সিভিল জজ, এর বেশি হলে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা হয়।
batwara mamla koto dine shesh hoy?
আইনে কোনো নির্দিষ্ট সময় বাঁধা নেই। লিখিত জবাবের পর মধ্যস্থতার জন্য সাধারণত ৬০ দিন, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন বরাদ্দ থাকে। আপস হলে সেখানেই শেষ, না হলে শুনানি আর আপিলের ওপর সময় নির্ভর করে।
এক শরিক রাজি না হলে কি বণ্টননামা করা যায়?
না, আপসের বণ্টননামায় সব শরিকের সই লাগে। একজনও রাজি না হলে বাটোয়ারা মামলাই পথ। জমির রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অফিসেও খোঁজ নিন।

এরপর পড়তে পারেন

যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি

জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।

সরকারি সাইট

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে আরও লেখা

সব লেখা
ভূমি সেবা

DCR ফি দেওয়ার পরও খতিয়ান প্রিন্ট না এলে যা দেখবেন

ই-নামজারির DCR ফি দেওয়ার পর খতিয়ান প্রিন্ট না এলে নতুন আবেদনের আগে পেমেন্ট স্ট্যাটাস, চালান আর আবেদন নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
ভূমি সেবা

ই-নামজারি শুনানি ও নামঞ্জুর: কোন কাগজ লাগবে

ই-নামজারির শুনানির নোটিশ এলে বা আবেদন Rejected দেখালে কারণটা কোথায় পড়বেন, কোন দলিল ও খতিয়ান গুছিয়ে রাখবেন, আর আবার আবেদনের আগে কী ঠিক করবেন।

অনেকে খোঁজেন