সংক্ষেপে
কাজ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক অভিবাসন ঋণ আর নারী অভিবাসন ঋণ দেয়, সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা, জামানত ছাড়া, তবে জামিনদার লাগে। দেশে ফিরে ব্যবসা করতে চাইলে পুনর্বাসন ঋণ মেলে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। বিদেশে ভাষা শিক্ষা বা বিশেষ দক্ষতার জন্য ১ থেকে ১০ লাখ টাকার আলাদা ঋণও আছে।
ব্যাংক ৫ অক্টোবর ২০২৬ যে সুদহারের তালিকা ওয়েবসাইটে দিয়েছে (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুযায়ী), তাতে অভিবাসন, নারী অভিবাসন ও পুনর্বাসন ঋণে বার্ষিক ৯%, নারী পুনর্বাসন ঋণে ৭%। অভিবাসন আর নারী অভিবাসন ঋণের আবেদন মাইগভে অনলাইনে করা যায়, বাকিগুলো শাখায় গিয়ে।
প্রতিটি ঋণের নিয়ম, শাখার ঠিকানা, সুদহারের নোটিশ আর মাইগভে অনলাইন আবেদনের লিংক এখানে পাবেন।
এই লেখায়
১. কোন ঋণ কার জন্য, সুদ কত
নিচের সুদহার ব্যাংকের ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের নোটিশে সংযুক্ত তালিকা থেকে নেওয়া। সব হার সরল সুদ। ঋণসীমা আর কার জন্য, তা প্রতিটি ঋণের নিজস্ব পাতায় লেখা।
| ঋণ | কার জন্য | সর্বোচ্চ | সুদ |
|---|---|---|---|
| অভিবাসন ঋণ | কাজ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, বা রি-এন্ট্রি ভিসায় আবার যাচ্ছেন | ৩ লাখ টাকা | ৯% |
| নারী অভিবাসন ঋণ | বিদেশগামী নারী কর্মী | ৩ লাখ টাকা | ৯% |
| পুনর্বাসন ঋণ | রাজনৈতিক, সামাজিক বা নিয়োগকর্তার হয়রানিতে দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করতে চান | ৫০ লাখ টাকা | ৯% |
| নারী পুনর্বাসন ঋণ | একই কারণে দেশে ফেরা নারী কর্মী | ৫০ লাখ টাকা | ৭% |
| বিশেষ দক্ষতা অর্জন ঋণ | বিদেশের প্রতিষ্ঠানে ভাষা বা দক্ষতার কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন | ১০ লাখ টাকা (সর্বনিম্ন ১ লাখ) | বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রি-ফাইন্যান্সে ৯%, নিয়মিত ১১% |
| অভিবাসী বৃহৎ পরিবার ঋণ | প্রবাসী বা ফেরত কর্মী নিজে, অথবা তাঁর ওপর নির্ভরশীল বাবা, মা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, ভাই, বোন | ৫০ লাখ টাকা | পুরুষ ৯%, নারী ৭% |
একই তালিকায় আরও কয়েকটি ঋণের হার আছে: বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ, আত্মকর্মসংস্থান ঋণ আর স্টার্ট-আপ ফান্ড ঋণ ৪%, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক সাধারণ ঋণ পুরুষের জন্য ৯% ও নারীর জন্য ৭%, সিএমএসএমই ও কৃষি ঋণ ৯%। এগুলোর শর্ত শাখা থেকে জেনে নিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংক সময়ে সময়ে সুদহার নতুন করে প্রকাশ করে। ঋণ নেওয়ার আগে ওয়েবসাইটের নোটিশ অংশে সর্বশেষ 'সুদহার' নোটিশ দেখে নিন।
২. অভিবাসন ঋণ: কে পাবেন, কী লাগে, খরচ কত
আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়, বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছর। আপনি আর আপনার জামিনদার দুজনকেই শাখার এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনজিওর ঋণখেলাপি হলে এই ঋণ পাবেন না।
আবেদনকারীর কাগজ
- প্রসেসিং ফি ০.৫০% আর ডকুমেন্টেশন ফি ০.৫০%, দুটোর সঙ্গে ভ্যাট।
- ঝুঁকি আচ্ছাদন স্কিমে প্রতি লাখ টাকায় ৯০০ টাকা।
- স্ট্যাম্প: ১০ টাকার ১৬টি রেভিনিউ স্ট্যাম্প, আর প্রত্যেক জামিনদারের জন্য ১০০ টাকার ৩টি অ্যাডহেসিভ স্ট্যাম্প।
- কাগজ ঠিক থাকলে ঋণ মঞ্জুর হতে ৭ কর্মদিবস লাগার কথা।
নারী অভিবাসন ঋণে কাগজ প্রায় একই, সঙ্গে অভিবাসন খরচের প্রমাণ আর জানা থাকলে বিদেশের কর্মস্থলের তথ্য চাওয়া হয়। ব্যাংকের পাতায় সচ্ছল জামিনদারের কাগজ চাওয়া আছে। কতজন জামিনদার লাগবে, শাখায় জেনে নিন।
৩. আবেদন: মাইগভে অনলাইনে, নয়তো শাখায়
- ১নিজের এলাকার শাখা ঠিক করুনযে এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, সেই এলাকার শাখাতেই ঋণ হয়। পুনর্বাসন বা বৃহৎ পরিবার ঋণে প্রকল্প যেখানে, সেখানকার শাখায় আবেদন করতে হয়। শাখার তালিকা ব্যাংকের ওয়েবসাইটে আছে।
- ২মাইগভে লগইন করে ফরম পূরণঅভিবাসন ঋণ আর নারী অভিবাসন ঋণের আবেদন মাইগভে হয়, ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সরাসরি লিংক দেওয়া আছে। নাগরিক লগইন করে আবেদন বাটনে চাপুন, লাল তারকা দেওয়া সব ঘর পূরণ করুন। চাইলে খসড়া সেভ করে পরে ড্যাশবোর্ড থেকে ঠিক করা যায়।
- ৩ছবি আর কাগজ আপলোড করুনআপনার ছবি, পাসপোর্ট, ভিসা, বিএমইটি কার্ড, NID আর জামিনদারদের NID ও ছবি লাগে। প্রতিটি ফাইল JPEG, JPG বা PNG হতে হবে, ১ MB-র মধ্যে। একটি আপলোড শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
- ৪দাখিল করে নম্বর রাখুনশেষে দাখিল বাটন না চাপলে আবেদন শাখায় পৌঁছায় না। দাখিলের পর এসএমএসে আবেদন নম্বর আর ট্র্যাকিং নম্বর আসে। মাইগভের নিয়মে একজন একবারে একটিই আবেদন করতে পারেন।
- ৫সিদ্ধান্তের পর ফি আর কাগজআবেদন জমা দিতে টাকা লাগে না। ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিলে ড্যাশবোর্ডে বা এসএমএসে জানায়, তারপর ঋণের অঙ্ক অনুযায়ী ফি দিতে হয়। চেকের পাতা, স্ট্যাম্প আর মূল কাগজ কবে শাখায় দেবেন, সেটা শাখা জানিয়ে দেবে।
পুনর্বাসন, নারী পুনর্বাসন, বিশেষ দক্ষতা আর বৃহৎ পরিবার ঋণের আবেদন শাখায় গিয়ে ব্যাংকের ফরমে করতে হয়। পুনর্বাসন ঋণে কাগজ ঠিক থাকলে ১৫ কর্মদিবস আর বিশেষ দক্ষতা ঋণে ৭ থেকে ১৫ কর্মদিবস লাগার কথা।
৪. জামানত আর জামিনদারের নিয়ম
অভিবাসন ঋণে জামানত লাগে না, লাগে অন্তত ২ জন জামিনদার। একজনকে সচ্ছল হতে হয়, তিনি সই করা ৩টি MICR চেক, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর আয় বা পেশার প্রমাণ দেবেন। অন্যজন পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়। প্রত্যেক জামিনদারের ছবি, NID-র কপি আর স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণও লাগে।
| ঋণের অঙ্ক | পুনর্বাসন ও বৃহৎ পরিবার ঋণ | বিশেষ দক্ষতা ঋণ |
|---|---|---|
| ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত | জামানত লাগে না | জামানত লাগে না; একজন জামিনদার আর তাঁর চালু হিসাবের ৩টি চেক |
| ৩ লাখের বেশি থেকে ৫ লাখ | সহজামানত, জমির মূল দলিল ও হাল খাজনার কাগজ ব্যাংকে জমা | ঋণের অন্তত দ্বিগুণ মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির মূল দলিল জমা, সঙ্গে একজন জামিনদার |
| ৫ লাখ টাকার বেশি | স্থাবর সম্পত্তি ব্যাংকের নামে রেজিস্টার্ড বন্ধক | ঋণের অন্তত দ্বিগুণ মূল্যের সম্পত্তি রেজিস্টার্ড বন্ধক আর অপরিবর্তনীয় আমমোক্তারনামা |
- পুনর্বাসন ঋণে বাবা, মা, ভাই, বোন, স্বামী বা স্ত্রী, নিকটাত্মীয় বা যেকোনো সচ্ছল ব্যক্তি জামিনদার হতে পারেন। জামিনদারের সিআইবি রিপোর্ট পরিষ্কার থাকতে হয়।
- বৃহৎ পরিবার ঋণের নীতিমালায় একজন জামিনদার সর্বোচ্চ দুজন ঋণগ্রহীতার জামিনদার হতে পারেন। জামানতের সম্পত্তি ধরা হয় বাজারদর আর মৌজা মূল্যের যেটি কম, তার অন্তত দেড় গুণ।
- পুনর্বাসন ঋণে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, বৃহৎ পরিবার ঋণে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে। দুই ঋণেই প্রকল্পের বিবরণ আর আয়-ব্যয়ের হিসাব লাগে, ভাড়া দোকানে ব্যবসা হলে ভাড়ার চুক্তিপত্রও।
৫. কিস্তি আর পরিশোধ
- অভিবাসন ও নারী অভিবাসন ঋণ: গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩ বছর। গ্রেস পিরিয়ড শেষে সমান মাসিক কিস্তি।
- বিশেষ দক্ষতা ঋণ: মেয়াদ ২ থেকে ৫ বছর। প্রথম ৬ মাস কিস্তি দিতে হয় না, তারপর সমান মাসিক কিস্তি।
- পুনর্বাসন ও নারী পুনর্বাসন ঋণ: সর্বোচ্চ ১০ বছর, মেয়াদি বা চলতি ঋণের ধরন অনুযায়ী কিস্তি।
- বৃহৎ পরিবার ঋণ: ব্যবসার ধরন অনুযায়ী মেয়াদ আলাদা। যেমন মুদি দোকানে ৫ বছর, ১ মাস গ্রেস পিরিয়ড আর ৫৯টি মাসিক কিস্তি; গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে ১ বছর, ১১ মাস পর এককালীন পরিশোধ।
কিস্তি দেরিতে দিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী দণ্ড সুদ লাগে। বৃহৎ পরিবার ঋণের নীতিমালায় মেয়াদ পেরোলে খেলাপি ঋণে নির্ধারিত সুদের সঙ্গে আরও ২% যোগ হয়। কিস্তি শাখায় জমা দেওয়া যায়, আবার ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া সোনালী ব্যাংকের অনলাইন পেমেন্ট লিংক থেকেও দেওয়া যায়।
ফরম বিনা মূল্যে, আর ফি শুধু ওপরে লেখা হারে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কাটা হয়। কেউ ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে আলাদা টাকা চাইলে ব্যাংকের হটলাইন ১৬২৩৮ নম্বরে জানান, অথবা সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থায় (জিআরএস) অভিযোগ করুন।
৬. অনেকে যা জানতে চান
বিদেশে ভাষা শেখার ঋণে কি জামানত লাগে?
প্রবাসী নিজে ঋণখেলাপি হলে পরিবারের কেউ বৃহৎ পরিবার ঋণ পাবেন?
ঋণের টাকা কীভাবে হাতে পাব?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।