
সংক্ষেপে
ইচ্ছামতো বয়স কমানো বা বাড়ানোর সুযোগ জন্ম নিবন্ধনে নেই। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ২০২৩ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, সনদ নেওয়ার পর কেউ এনআইডি, পাসপোর্ট বা পাবলিক পরীক্ষার নিবন্ধনে অন্য জন্ম তারিখ দিলে, পরে সেই তারিখে সনদ বদলানোর আবেদন নিবন্ধক কার্যালয় গ্রহণই করবে না।
তবে নিবন্ধনের সময় বা হাতে লেখা সনদ অনলাইনে তোলার সময় সত্যিই ভুল হলে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে জন্ম তারিখ সংশোধন হয়। আবেদন ফি ১০০ টাকা, আর জন্মসালের ভুলে সিদ্ধান্ত সাধারণত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেন।
অনলাইনে আবেদন জমা দিয়ে প্রিন্ট নিয়ে নিবন্ধকের কার্যালয়ে যেতে হয়। পোর্টাল ২৫ অক্টোবর সকাল ৬টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণে বন্ধ।
এই লেখায়
১. জন্ম নিবন্ধনে বয়স কমানো যাবে কি: সোজা উত্তর
চাকরির বয়সসীমা, বিদেশে কাজের ভিসা বা খেলাধুলার বয়সভিত্তিক দলে সুযোগ পেতে অনেকে জন্ম নিবন্ধনে বয়স কমানোর কথা ভাবেন। আইনের চোখে জন্ম সনদের জন্ম তারিখ মানে আসল জন্মের তারিখ। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট, এনআইডি সবকিছুর বয়স এখান থেকেই ধরা হয়। তাই শুধু সুবিধার জন্য বয়স কমানোর কোনো নিয়ম নেই।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সব ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড আর বিদেশের মিশনকে একটি নির্দেশনা পাঠায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী তাতে বলা হয়েছে:
- জন্ম সনদ নেওয়ার পর কেউ পাবলিক পরীক্ষার নিবন্ধন, এনআইডি বা পাসপোর্টে ভিন্ন জন্ম তারিখ ব্যবহার করলে, সেই তারিখ বহাল রাখতে সনদ সংশোধনের আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
- নিবন্ধক কার্যালয় এমন আবেদন গ্রহণ, আপলোড বা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠাবে না।
- সত্যিকারের ভুল হলে ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে সংশোধন করা যাবে।
অর্থাৎ উল্টো দিক থেকে ভাবতে হবে। এসএসসি সনদ বা এনআইডির জন্ম তারিখ জন্ম সনদের সঙ্গে না মিললে কর্তৃপক্ষ সাধারণত পরের কাগজগুলো জন্ম সনদ অনুযায়ী ঠিক করতে বলে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রথম আলো এমন এক আবেদনকারীর কথা লিখেছিল, যাঁকে শিক্ষাসনদ, এনআইডি আর পাসপোর্ট জন্ম সনদের সাল অনুযায়ী মেলাতে বলা হয়েছিল।
২. কোন ক্ষেত্রে জন্ম তারিখ সংশোধন হয়
সব সংশোধনের দরজা বন্ধ নয়। যে ভুলগুলো সাধারণত প্রমাণ দিয়ে ঠিক হয়:
- নিবন্ধনের সময় তথ্য তুলতে গিয়ে টাইপের ভুল, যেমন ২০০৫ লিখতে গিয়ে ২০০৬।
- হাতে লেখা সনদ অনলাইনে তোলার সময় অন্য কারও তারিখ বসে যাওয়া। প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে খুলনার এক আবেদনকারীর সনদে মেয়ের জন্মসাল বসে গিয়েছিল, পরে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় আবেদন গ্রহণ করে।
- জন্ম সনদ নেওয়ার আগেই পাসপোর্ট বা এনআইডি করা ছিল, আর সেটাই আসল তারিখ। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এমন মানুষ নতুন নিবন্ধনে এনআইডি বা পাসপোর্টকে জন্ম তারিখের প্রমাণ হিসেবে দিতে পারবেন।
রেজিস্ট্রার জেনারেল ২০২৩ সালে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, হাতে লেখা থেকে অনলাইনে নেওয়ার সময় সাল ভুল উঠেছে বলে যাচাইয়ে প্রমাণ হলে তা সংশোধন করা হয়। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে জন্মসাল বদলাতে চান বলে কর্তৃপক্ষ এখানে সাবধান।
৩. জন্ম নিবন্ধন বয়স সংশোধন করতে কি কি লাগে, কত টাকা
আবেদনের আগে যা গুছিয়ে রাখবেন
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ফি তালিকা অনুযায়ী জন্ম তারিখ সংশোধনের আবেদন ফি ১০০ টাকা। নাম বা ঠিকানার মতো অন্য তথ্যে ফি ৫০ টাকা। সংশোধন মঞ্জুর হলে বাংলা ও ইংরেজি সনদের কপি বিনা ফিতে পাওয়ার কথা। ফি দেওয়ার রসিদ রেখে দিন।
সময়ের হিসাবও জেনে রাখুন। আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী সনদ পাওয়ার ৯০ দিন পার হলে নিবন্ধক নিজে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। আবেদন যায় ইউএনও, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা বা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে, আর সেখানে ১৫ কর্মদিবসে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জন্মসালের ভুলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে, আর বাস্তবে কয়েক মাসও লেগেছে।
৪. জন্ম তারিখ সংশোধনের আবেদন যেভাবে করবেন
- ১আগে নিশ্চিত হোন ভুলটা কোথায়জন্ম সনদ, টিকা কার্ড, এসএসসি সনদ আর এনআইডি পাশাপাশি রাখুন। কোনটির তারিখ আসল, তার পক্ষে সবচেয়ে পুরোনো কাগজ কোনটি, তা ঠিক করুন।
- ২BDRIS-এ সংশোধনের আবেদন জমা দিনbdris.gov.bd-তে জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের অংশে নিবন্ধন নম্বর আর জন্ম তারিখ দিয়ে ঢুকুন। জন্ম তারিখের ঘরে সঠিক তারিখ লিখুন, কারণ বেছে দিন আর প্রমাণ আপলোড করুন।
- ৩প্রিন্ট নিয়ে নিবন্ধকের কার্যালয়ে যানযে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে সনদ নিয়েছিলেন, সেখানে প্রিন্ট আর মূল কাগজ দেখান। ফি জমা দিয়ে রসিদ নিন।
- ৪যাচাই বা শুনানির খবর রাখুনঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রমাণ দেখতে চাইতে পারেন। মোবাইল চালু রাখুন, ডাকলে মূল কাগজ নিয়ে হাজির হোন।
- ৫মঞ্জুর হলে বাকি কাগজ মেলাননতুন সনদ পেলে everify.bdris.gov.bd-তে যাচাই করুন। তারপর দরকার হলে এনআইডি বা পাসপোর্ট সংশোধনে যান।
আইনের ২১ ধারায় বলা আছে, জন্ম নিবন্ধনে জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা দুটোই হতে পারে।
৫. আবেদন ফেরত এলে কী করবেন
জন্ম তারিখের আবেদন নামঞ্জুর হলে আগে লিখিত কারণটা জেনে নিন। কারণ যদি হয় প্রমাণ কম, তাহলে আরও পুরোনো কাগজ জোগাড় করে নতুন আবেদন করা যায়। আর যদি মনে করেন প্রমাণ থাকার পরও ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছে, আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারেন। ইউএনওর আদেশের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে, জেলা প্রশাসকের আদেশের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে।
আবেদন যদি ২০২৩ সালের নির্দেশনার আওতায় পড়ে, অর্থাৎ পরে বানানো কাগজের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা, তাহলে বারবার আবেদনে ফল বদলানোর সম্ভাবনা কম। তখন বাস্তব পথ হলো এনআইডি বা অন্য কাগজ জন্ম সনদ অনুযায়ী ঠিক করা।
৬. অনেকে যা জানতে চান
জন্ম নিবন্ধন বয়স কমানো কি জায়েজ বা বৈধ?
জন্ম নিবন্ধন বয়স সংশোধন করতে কত টাকা লাগে?
জন্ম নিবন্ধন বয়স সংশোধন করতে কতদিন সময় লাগে?
এসএসসি সনদ অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধনের বয়স বদলানো যাবে?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।