সংক্ষেপে
মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধন করলে কোনো ফি লাগে না। আবেদন করেন সাধারণত মৃত ব্যক্তির ছেলে, মেয়ে, স্বামী বা স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য কেউ। bdris.gov.bd-তে 'নতুন মৃত্যু নিবন্ধন আবেদন' মেনুতে মৃত ব্যক্তির ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর আর জন্ম তারিখ দিয়ে ফরম শুরু হয়। তারপর প্রিন্ট কপি আর মৃত্যুর একটি প্রমাণ নিয়ে নিবন্ধক কার্যালয়ে জমা দিতে হয়।
সাকসেশন সার্টিফিকেট, পারিবারিক পেনশন, জীবনবিমার দাবি আর জমির নামজারিতে মৃত্যু প্রমাণের জন্য আইন অনুযায়ী এই সনদই লাগে। মৃত ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধন না থাকলে নিবন্ধক আগে বিনা ফিতে জন্ম নিবন্ধন করে তারপর মৃত্যু নিবন্ধন করেন।
'মৃত্যু নিবন্ধন' মেনুর 'নতুন মৃত্যু নিবন্ধন আবেদন' থেকে ফরম শুরু হয়।
এই লেখায়
১. মৃত্যু সনদ কোন কাজে লাগে
শোকের মধ্যে কাগজের কাজ পিছিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মৃত্যু নিবন্ধন দেরিতে হলে পরে সম্পত্তি, পেনশন বা ব্যাংকের কাজ আটকে যায়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনে বলা আছে, নিচের কাজগুলোতে মৃত্যু প্রমাণের জন্য এই আইনের অধীনে দেওয়া মৃত্যু সনদই ব্যবহার করতে হবে।
- আদালত থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেট (উত্তরাধিকার সনদ) নেওয়া
- পারিবারিক পেনশন পাওয়া
- মৃত ব্যক্তির জীবনবিমার টাকা দাবি করা
- জমির নামজারি ও জমাভাগ
এর বাইরেও ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ওয়ারিশ সনদ নিতে, কিংবা ব্যাংক হিসাব বা সঞ্চয়পত্রের টাকা দাবি করতে সাধারণত মৃত্যু সনদ চাওয়া হয়। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ভাষায়, মৃত্যু নিবন্ধন না হলে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা যায় না।
২. কে আবেদন করবেন, কোন কার্যালয়ে
আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ছেলে, মেয়ে বা অভিভাবক মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধকের কাছে মৃত্যুর তথ্য দিতে বাধ্য। তাঁরা না থাকলে বাবা, মা, ভাই, বোন, পুত্রবধূ, জামাতা বা নাতি-নাতনিও দিতে পারেন। হাসপাতালে মৃত্যু হলে হাসপাতালের প্রধান বা তাঁর দায়িত্ব দেওয়া কেউও তথ্য পাঠাতে পারেন। অনলাইন ফরমে আবেদনকারী হিসেবে পিতা, মাতা, স্বামী বা স্ত্রী, পুত্র, কন্যা অথবা অন্যান্য বেছে নেওয়া যায়।
- সাধারণ নিয়মে মৃত ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধন যে কার্যালয়ে হয়েছিল, মৃত্যু নিবন্ধনও সেখানে হয়।
- জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে থাকলে মৃত্যুর আগে তিনি যেখানে স্থায়ীভাবে থাকতেন, সেই এলাকার নিবন্ধকের কাছেও আইনানুগ উত্তরাধিকারী আবেদন করতে পারেন। সেই কার্যালয় পরে জন্ম নিবন্ধনের কার্যালয়কে জানিয়ে দেয়।
- গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ, শহরে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এলাকায় করপোরেশনের নির্ধারিত কার্যালয় (সাধারণত আঞ্চলিক কার্যালয়), ক্যান্টনমেন্টে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড।
- প্রবাসে মৃত্যু হলে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে আবেদন করা যায়। দূতাবাস মৃত্যুর তথ্য দেশে মৃত ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধনের কার্যালয়ে পাঠায় এবং আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি পরিবারের কাউকে বা সঙ্গে থাকা কাউকে দেয়।
অনলাইন ফরম শুরুই হয় মৃত ব্যক্তির ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে। নম্বর না থাকলে, বা পুরোনো হাতে লেখা সনদ অনলাইনে না থাকলে, সরাসরি নিবন্ধক কার্যালয়ে যান। বিধিমালা অনুযায়ী নিবন্ধক আগে জন্ম নিবন্ধন করে তারপর মৃত্যু নিবন্ধন করবেন, আর এই জন্ম নিবন্ধনের জন্য কোনো ফি লাগবে না। বয়সের প্রমাণ হিসেবে মৃত ব্যক্তির NID বা শিক্ষাগত সনদ সঙ্গে নিন।
৩. যে কাগজগুলো লাগবে
বিধিমালায় মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে কয়েক ধরনের কাগজের কথা আছে। এর যেকোনো একটি দিয়েই নিবন্ধন করা যায়, তাই হাতের কাছে যেটা আছে সেটা দিয়েই শুরু করুন।
মৃত্যুর প্রমাণ (যেকোনো একটি)
সঙ্গে আরও যা রাখবেন
অনলাইনে কাগজের ছবি আপলোড করতে হয় (JPG, JPEG বা PNG, প্রতিটি সর্বোচ্চ ২ মেগাবাইট), আর মূল কাগজ কার্যালয়ে দেখানোর জন্য সঙ্গে রাখুন। দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আর থানার কাগজের কপি যত্ন করে রাখুন। পরে আদালতে সাকসেশন সার্টিফিকেটের আবেদনে অন্য প্রমাণও চাওয়া হতে পারে।
৪. ফি, সময়সীমা আর কত দিনে সনদ
| কখন আবেদন | দেশে | বিদেশে দূতাবাসে |
|---|---|---|
| মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে | ফি নেই | ফি নেই |
| ৪৫ দিন পর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত | ২৫ টাকা | ১ মার্কিন ডলার |
| ৫ বছর পরে | ৫০ টাকা | ১ মার্কিন ডলার |
| পরে সনদের নকল কপি | ৫০ টাকা | ১ মার্কিন ডলার |
নিবন্ধনের পর প্রথম সনদের জন্য আলাদা ফি নেই। ফি দিলে নিবন্ধক কার্যালয় থেকে রসিদ নিন। আবেদন জমা নেওয়ার সময় কার্যালয় আপনার পরিচয় যাচাই করে সনদ নেওয়ার তারিখ লিখে দেয়। কাগজ ঠিক থাকলে বিধিমালা অনুযায়ী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন শেষ করে সনদ দেওয়ার কথা, আর দিতে না পারলে কারণ লিখিতভাবে জানাতে হয়।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ, অর্থাৎ ২০০৬ সালের ৩ জুলাইয়ের আগে মারা যাওয়া কারও মৃত্যু এই আইনে নিবন্ধন করা যায় না। এমন ক্ষেত্রে নামজারি, ওয়ারিশ সনদ বা ব্যাংকের কাজে মৃত্যুর কোন প্রমাণ চলবে, তা সংশ্লিষ্ট অফিসে জেনে নিন।
৫. অনলাইনে আবেদনের ধাপ
- ১মৃত ব্যক্তির রেকর্ড খুঁজুনbdris.gov.bd-তে 'মৃত্যু নিবন্ধন' মেনু থেকে 'নতুন মৃত্যু নিবন্ধন আবেদন' খুলুন। মৃত ব্যক্তির ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর আর জন্ম তারিখ দিন। যে রেকর্ড আসে, তাতে নাম আর বাবা-মায়ের নাম মিলিয়ে বেছে নিন।
- ২মৃত্যুর তথ্য দিনমৃত্যুর তারিখ আর কারণ লিখুন। স্বামী বা স্ত্রী থাকলে তাঁর নাম বাংলা ও ইংরেজিতে, সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন বা NID নম্বর দিন।
- ৩দুটি ঠিকানা দিনকোথায় মৃত্যু হয়েছে, আর মৃত্যুর সময় তিনি কোথায় থাকতেন। দুটি একই হলে টিক দিলেই চলে।
- ৪কাগজ আপলোড আর ঘোষণামৃত্যুর প্রমাণসহ কাগজগুলোর ছবি আপলোড করুন। দেওয়া তথ্য ঠিক এবং আগে কোথাও মৃত্যু নিবন্ধন হয়নি, এই ঘোষণায় সম্মতি দিন।
- ৫আবেদনকারীর তথ্য ও OTPমৃত ব্যক্তির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক বেছে নিয়ে নিজের জন্ম নিবন্ধন বা NID-র তথ্য দিন। মোবাইলে আসা OTP দিয়ে জমা দিন।
- ৬প্রিন্ট নিয়ে কার্যালয়ে যানজমা হলে পর্দায় যে আবেদনপত্র নম্বর আসে, তা লিখে রাখুন আর তখনই প্রিন্ট নিন। প্রিন্ট কপি, মূল কাগজ আর আপনার পরিচয়পত্র নিয়ে নিবন্ধক কার্যালয়ে জমা দিন।
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে প্রায় তিন মাস নিরাপত্তার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য অনলাইনে মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন বন্ধ ছিল, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে আবার খুলে দেওয়া হয়। সাইটে কখনো এমন সমস্যা হলে সরাসরি নিবন্ধক কার্যালয়ে গিয়েও আবেদন করা যায়, সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজের আইডি থেকে আবেদন তুলে দেন।
৬. সনদ হাতে পেলে যাচাই করে নিন
মৃত্যু সনদে ১৭ সংখ্যার একটি মৃত্যু নিবন্ধন নম্বর থাকে। সনদটি সরকারি ডাটাবেজে উঠেছে কি না, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের e-Verify পোর্টালে নিজেই দেখে নিতে পারেন।
- everify.bdris.gov.bd খুলে 'Click here to verify death record' লিংকে যান।
- ১৭ সংখ্যার মৃত্যু নিবন্ধন নম্বর দিন, আর মৃত্যুর তারিখ লিখুন বছর-মাস-দিন আকারে (যেমন 2026-03-15)।
- নিচের ছোট অঙ্কের উত্তর লিখে Search চাপুন।
- নাম, বাবা-মায়ের নাম আর মৃত্যুর তারিখ সনদের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
তথ্যে ভুল থাকলে BDRIS-এর 'মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য সংশোধন আবেদন' মেনু থেকে সংশোধনের আবেদন করা যায়। সনদ হারিয়ে গেলে যে কার্যালয়ে নিবন্ধন হয়েছিল সেখান থেকে নকল কপি নেওয়া যায়, ফি ৫০ টাকা। বিধিমালা অনুযায়ী আবেদনের ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কপি দেওয়ার কথা।
৭. অনেকে যা জানতে চান
অনেক বছর আগে মারা গেছেন, এখন কি মৃত্যু নিবন্ধন করা যাবে?
হাসপাতালে মৃত্যু হয়নি, ডাক্তারের কোনো কাগজ নেই। কী দেব?
মৃত্যু সনদ আর ওয়ারিশ সনদ কি একই?
যেখান থেকে তথ্য মিলিয়েছি
জেনে রাখুন: লেখাটি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য স্বাধীনভাবে লেখা, নাগরিক সেবা কোনো সরকারি দপ্তর নয়। লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ফি, তারিখ আর নিয়ম বদলাতে পারে, আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।